Sunday, March 1, 2026
spot_img
Homeকবিতাকবিতা মৃত্তিকামন

কবিতা মৃত্তিকামন

মৃত্তিকামন ॥ চাষা হাবিব

মৃত্তিকা।ছোট ছোট নিঃশ্বাস। ছোট ছোট দলা ধরা মুঠোয় ফুসফুস হাওয়ায় বেড়ে যাওয়া যন্ত্রণায় কেবলই সকালের রোদ, আলোয় আলোয় সরাতে থাকে অন্ধকার। আমি হন্তদন্ত ছুটে চলি শূন্য থেকে শূন্যে- সিড়ির প্রতিটি ধাপ যেন বুকের উপর চেপে ধরা জগদ্দল পাথর, সরাতে সরাতে আমার হৃদপিণ্ডে জেগে যায় মৃত্তিকার ঘ্রাণ। সযত্নে আগলাতে থাকি বুক পকেটে- ভাঁজে ভাঁজে; সেই ঘ্রাণ যত্নে তুলে রাখি সুবাশিত কর্পূরে। কেবিনের শীতল হাওয়ায় নড়বড়ে নিঃশ্বাস দমবন্ধে আটকা পড়ে, সেঘরে তোমার স্পন্দন সৌরভ ছড়ায় সোফার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
আমরা গোল হই;
আমরা দলবদ্ধ হই;
আমরা নিঃশ্বাস হই;

—চাপালি কাঠের গন্ধে তোমার সুবাস পৌঁছে যায়। অথচ আরো দূরে- দূরে কিংবা নিকট দূরে তোমার স্পন্দনে পুলকিত শরীর ভার টানতে টানতে পৌঁছে যায়—
যেখানে রাতের নরম শিশির;
যেখানে ভোরের তুলতুলে আলোয়;

—তোমার জন্য শিহোরিত মা, বুনতে থাকে মখমলের আদুরে চাদর। তখনও রাত জেগে বুনতে থাকা তোমার জন্য— শুধু তোমার জন্য; এক চিলতে রোদ্দুরে তুলে আনে মা নরম শ্বাস। অথচ নিঃশ্বাস আটকে— তোমার জন্য মৃত্তিকায় জমে যায়;
বীজঘ্ন কৌশলে আমরা তুলে ফেলি—
তুলে ফেলি ফসলের ঘুম;
তুলে ফেলি নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে—
আধো আধো পরম তৃষ্ণায়।

অথচ মা নিঃশ্বাস বন্ধ করে— ফু দেয় নরম শরীরে, বাবা ছুটতে ছুটতে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে, যেনো দম জুড়ে যায়— নরম মৃত্তিকায়;
যেখানে বুদ হয়ে ধ্যান করে সশ্যাল
যেখানে তপস্যায় জেগে থাকে প্রাণরস;
যেখানে নিবিড় আলিঙ্গন ধরে ফেলে—
যেখানে উত্তোরীয় পাহারায় ক্লান্ত ভাই— দম ফেলে বারবার।

আমরা সমবেত হই— আমরা কোরাস হই— গাইতে থাকি উদ্বোধনী বিউগল। জড়ো হতে থাকে হাতের কনুই—তালু—জিহ্বা; দূরে আরো দূরে যেখানে তোমার জন্য প্রস্তুত করতে করতে উল্লাসে ফেটে যায় নানুর বুক, নানীর আঁচল, আর ছোট্ট মায়ের মনপোড়া বুক। আমরা আর্তনাদ করি- অথচ সিড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বাবা ঠিকই পৌঁছে যায়— বাবা যে কাঁদে না- কাঁদতে জানে না, কেবলই ঘামতে ঘামতে ভিজে ফেলে দেহের সব।

—এভাবেই শবযাত্রায় শামিল হয় বাবার সমন। এভাবেই কাঁধে তুলে নেয় মৃতদেহ, জগদ্দল পাথরের মতন বুকে চেপে বসে যায়— বাবার কবজ। সিড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে উঠে যায়- আবার নেমে পড়ে আবার ওঠে— বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যাওয়া যন্ত্রনায়; সকাল গড়িয়ে বিকেল থেকে রাত অতঃপর সকাল। নলের শরীর নিয়ে ছোট দেহটা শ্বাস টানে, বাবাও বসে বসে শ্বাস নেয়— দীর্ঘশ্বাস। সোফায় ঝিম মেরে দম দেয়- রুদ্রাক্ষ আর তসবির মাল্য আঙ্গুলে যপতে যপতে- বেড়ে যায় দীর্ঘশ্বাস। ছোট্ট তুলতুলে শরীর যেন যন্ত্রণায় কাতরায়; মৃত্তিকায় মিশে যাওয়া শরীরের মতন বাবাও মিশে নেয় কস্তুরি ঘ্রাণ— যে ঘ্রাণে সুবাস ছড়ায় নলঘর। যেখানে রৌদ্রময় করোটিতে জৌলুশ শীতল বাতাস; সেখানে বাবা ঘামে আর ঘামে— যেনো হৃদপিণ্ডে চরম চাপ, বেঁধে ফেলে পাঁজরের ঘুণ। বেঁধে ফেলে স্পর্শের নরম সূতোয় পিতৃত্বের দাগ। মা তো নিঃশ্বাস বন্ধ করে সন্তানের নিঃশ্বাসে ঢেলে দেয় সঞ্জিবনী আঁশ। অমরায় গেঁথে দেয় দেহতরী ধনন্বন্তর যৌবন। দীর্ঘ যাপিত রসের উচ্ছ্বাস খর স্রোতে দেহ থেকে দেহে ঢেলে দেয় তরলজীবন।
মা তো জেগে জেগে রাতের সমগ্রতায়—
দিনের নিমগ্নতায় উষ্ণ আলিঙ্গনে সব শুষে নেয়— সব শুষে দেয়;

অথচ বুকের পাঁজর ভেঙ্গে মাকেও কাতরাতে হয়— মাকেও পরীক্ষায় উত্তীর্ণের জন্য পাড়ি দিতে হয় লবণ—তেলের মত বায়বীয় উদ্যানে। উদ্ভ্রান্তের মতো মাকেও নিতে হয় সুই ফুঁড়ে প্রাণতরী প্রাণরস। শুধু মৃত্তিকায় নিজের অবগুণ্ঠিত অবয়ব, নিজের চেতনালব্ধ নাড়ীর টানে— কাটতে কাটতে দেহের ভাঁজে ভাঁজে মাকেই নিতে হয় চেতনানাশকের তীব্র জ¦লন। কাঁচি-ছুরির তলদেশে মাকেই হতে হয় ব্যবচ্ছেদ- অথচ কান্নার জলেই মৃত্তিাময় স্রোতে ভাসতে ভাসতে ভাসায় মা তাঁর বর্ণহীন— বর্ণমালায় তাঁর আদিম অন্ধ ক্যারাভান। মাকেই হতে হয় কয়েদির পোষাকে সয্যাশায়ী মৃতশর।

এভাবেই তোমার জন্য মা হয়ে উঠেন ঐশরীক মহাজাতক মৃত্তিকা মন॥

১৫ আগষ্ট ২০২৩; দিনাজপুর।

পড়ুন : দীর্ঘ কবিতা

Chasa Habib
Chasa Habibhttp://chasahabib.com
Chasa Habib, a Bangladeshi poet, writer and a researcher writing in Bengali language. More than 12 books are published.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments