Sunday, March 1, 2026
spot_img
Homeশ্রদ্ধাঞ্জলি/স্মরণনাট্যজন মাজেদ রানা

নাট্যজন মাজেদ রানা

দশম মৃত্যুবার্ষিকীতে চাষা’র প্রণতি

নাট্যজন মাজেদ রানা

( সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ ১৬ জুলাই ২০১৬)

দিনাজপুরের শতবর্ষের নাট্যচর্চায় এক নীরব কিংবদন্তির নাম— নাট্যজন মাজেদ রানা। নাট্যাভিনেতা, নির্দেশক, শিক্ষক ও সংগঠক হিসেবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। নিভৃতচারী অথচ দীপ্তিমান এই শিল্পী শুধু মঞ্চে অভিনয় করতেন না— নির্দেশনা দিতেন, মানুষ গড়তেন, সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতেন।

নাট্যচর্চা তাঁর কাছে কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না— ছিল সমাজ ও সময়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাটক যদি মানুষের কথা না বলে, তাহলে সে কেবল বিনোদন — শিল্প নয়। এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন একটি জীবন। নাটক ছিল তাঁর নিঃশ্বাসের মতো— আর সংস্কৃতি ছিল জীবনের পথ ও পাথেয়।

সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মাজেদ রানা ছোটবেলা থেকেই আকৃষ্ট ছিলেন নাটক ও সংস্কৃতিচর্চার প্রতি। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন, আর স্থানীয় মঞ্চে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের প্রতিভা মেলে ধরেন। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি নাট্যচর্চায় তাঁর অনুরাগ ছিল অটুট।

নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর, শ্রেণিবৈষম্য, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবোধের মতো বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে তাঁর নাটকে। তিনি তুলে ধরতেন গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, শহুরে সংকট, আর সময়ের অভিঘাত। মাজেদ রানা সেই বিরল মানুষ, যিনি নিজের শহরে থেকেও হয়ে উঠেছিলেন একটি পরিপূর্ণ নাট্যজীবন।

তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন ১০টিরও বেশি নাটকে— যার প্রতিটিতে ছিল এক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন শৈল্পিক প্রকাশ। সংলাপ ছাড়াও নীরবতা, আলোক, শব্দ ও দেহভাষা হয়ে উঠেছে তাঁর নির্দেশনার ভাষা।

নাট্যগঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। স্থানীয় বিভিন্ন নাট্যসংগঠন ও নাট্যচক্রে তিনি নাট্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর গড়া শিষ্যরা আজ ছড়িয়ে আছেন দেশের নানা প্রান্তে, নাট্যচর্চায় নিয়োজিত হয়ে। আবৃত্তিকার হিসেবেও তিনি ছিলেন সমাদৃত— তাঁর দরাজ গলার উচ্চারণ মুগ্ধ করত শ্রোতাকে। তিনি অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন নাট্যোৎসবে, সেমিনারে, নবীন দলের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছেন।

তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নিজ শহরের মাটিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন ভালোবাসায়। ঢাকার আলো-ঝলমলে দুনিয়া তাঁকে টানেনি। ছোটখাটো চাকরি করে নাটকের মহড়ায় দৌড়ে যেতেন, সংস্কৃতির পতাকা হাতে করে।

নাট্যজন মামুনুর রশীদ তাঁর প্রয়াণে লিখেছেন—জন্ম যদি উত্তরবঙ্গে, তুমি নট বাংলার: মাজেদ রানা

তাঁর ভাষায়—
‘শান্ত, স্থিতধী, কল্পনায় ডুবে থাকা স্বল্পভাষী মানুষটি সত্যিই আমাদের চেয়ে বড়। অভিনয় দিয়ে তিনি উত্তরবঙ্গ থেকে সারা দেশে একটা ঝড় তুলেছিলেন। চলচ্চিত্র, টেলিভিশনের মায়ামৃগতে কখনো আকৃষ্ট হননি। মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকেছেন দিনাজপুরে। ছোটখাটো একটা চাকরি করে মাজেদ রানা ছুটে যেতেন নবরূপীর মহড়ায় বা আড্ডায়।… যিনি অভিনয় করতেন যামিনীর শেষ সংলাপ নাটকে, চমৎকার বুলন্দ আওয়াজ তাঁর কণ্ঠে, সেই সঙ্গে আছে বাচনভঙ্গি।’

তিনি আরও বলেন—
দিনাজপুরের লোকদের উচ্চারণভঙ্গি অনেকটা প্রমিত। বিশাল মাপের এই অভিনেতা বহু বছর ধরে কাঁপিয়েছেন দিনাজপুরের নাট্য সমিতির মঞ্চ, যেখানে অবিভক্ত ভারতের খ্যাতিমান অভিনেতারা এসেছেন। কী সব অসাধারণ নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন! যামিনীর শেষ সংলাপ, ক্যাপ্টেন হুররা, রক্ত করবী, টিপু সুলতান, ইত্যাদি ধরনের প্রভৃতি, ইডিপাসসহ অনেক নাটক। কখনো নিজেকে জড়াননি সুবিধাবাদে, রাজনীতিতে বা থিয়েটারের জন্য যেটুকু রাজনীতি তাতেও নেই।। দিনাজপুরের নাট্যকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন স্যার, স্যারের সামনে সবাই শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে মাথা নুয়ে থাকত। সফল সার্থক সব নাটক। পরিচালক এবং অভিনেতা হিসেবে পদক পেয়েছেন, সম্মাননাও পেয়েছেন অনেক।

অদ্ভুত আমাদের নাট্য সংস্কৃতি! অন্য দেশে এ রকম হয় না। ঢাকায় না থাকলেই তিনি অপাঙ্‌ক্তেয়। যত বড় পরিচালক, নাট্যকার আর অভিনেতা, আবৃত্তিকার, চারুশিল্পী বা সংগীতশিল্পী হন না কেন তিনি থাকেন কোথায়, এটাই বড় কথা। নিজের শহরের মহত্তম শিল্পীটির কদর করেন না কিন্তু ঢাকার সাধারণ বা মাঝারি মেধার শিল্পীকে নিয়ে মেতে ওঠেন। এই প্রবণতাই আমাদের নাট্য সংস্কৃতির একটা বড় সমস্যা। সীমান্তের ওপারেই বালুর ঘাটের অথবা মণিপুরের একজন নাট্যকার বা পরিচালক হয়ে ওঠেন ভারতের জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব, এখানে তা যেন অসম্ভব। অথচ আমরা প্রায় সবাই এসেছি গ্রাম অথবা ঢাকার বাইরের ছোট শহর থেকে।

আজ তাঁর মৃত্যুর এক দশক পর, আমরা অনুভব করি সেই শূন্যতা। কিন্তু তাঁর রচিত নাট্যভিত্তি, বপন করা চেতনার বীজ আমাদের ভিতরে বেঁচে আছে। তিনি ছিলেন এক জীবনদর্শন, এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ছায়াপাত। তাঁর সৃষ্টি, দর্শন ও স্মৃতি আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবে দীর্ঘকাল।

তোমার নাট্যপ্রয়াণ হোক আমাদের অন্তরে নাট্যজাগরণের অনুপ্রেরণা।
নাটক হোক মানুষের, মাটির মনের।

চাষা হাবিব
কবি ও গবেষক, দিনাজপুর।

Chasa Habib
Chasa Habibhttp://chasahabib.com
Chasa Habib, a Bangladeshi poet, writer and a researcher writing in Bengali language. More than 12 books are published.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments