Sunday, March 1, 2026
spot_img
Homeমুখবন্ধমুখবন্ধ: কিছুক্ষণ অতঃপর

মুখবন্ধ: কিছুক্ষণ অতঃপর

মুখবন্ধ

কবি মো. আব্দুল হাই।
অগ্রজ প্রবীণ কবি। মনন চেতনাচাষী এই কবির কবিতায় মানুষের মানবিক ও অগ্রাধিকার মনন নৈতিকতার সৌন্দর্যপ্রিয়তা প্রাধান্য পায়। তাঁর কবিতায় প্রাণ পায় মানুষ এবং মানস জনম। বলা হয়, কবিতা বোঝার আগে কবিকে বুঝতে হয় বা কবিকে পাঠ করতে হয়, তবেই কবির কবিতার পাঠগম্যতা এবং কবিতার শরীরে প্রবেশ করা যায়। যদিও এখনো কবিকে সেই অর্থে পড়া বা বোঝার সুযোগ হয়ে ওঠেনি, তবে খুব কাছ থেকে কবিকে দেখার এবং মেশার সুযোগ থেকেই এই আলোচনার ধৃষ্টতা। একজন নিঃসঙ্গ শেরপা হয়েই কবি চলছেন বেদনার্ত কালচক্রে। স্ত্রীর অকাল বিয়োগও কবির মনোবেদনার অন্যতম কারন, ফলে কবির কবিতায় সেই বেদনার সুর যেনো বেজে চলে প্রতিটি ছত্রের শরীর জুড়ে।

আমরা জানি, কবিতা কখনো দশক বিবেচনায় বিবেচ্য হয় না, তথাপিও কবিতার অবয়বকে বুঝতে দশক সহায়তা করে বলেই আমরা মো. আবদুল হাই কে আটের দশকের কবি অনায়াসে বলতেই পারি। যদিও তার প্রকাশিত দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘প্রণয় পালকি-২০১৯ ও ‘কিছুক্ষণ অন্তরাল অতঃপর- ২০২২’সালে প্রকাশিত। কবি এক সময় এইচ এম গালিব নামে লেখালেখি করেছেন। মো. আবদুল হাই কবি গালিব নামেই দিনাজপুরে খ্যাত। কবির জন্ম ২৮ আগষ্ট ১৯৫৪ খ্রি. বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ বরেন্দ্রমুখ খ্যাত দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মালগাঁও গ্রামে। পেশাগত জীবনে তিনি অডিটর হিসেবে সরকারি হিসাব রক্ষণ অফিস থেকে অবসর নিয়েছেন। তিন সন্তানের জনক এই কবির প্রথম সন্তান কন্যা। তিনিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বর্তমানে স্বামী ড. আবু সাঈদ এর কর্মস্থল রাজশাহী প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ে বসবাস করছেন। সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছেন এসথেটিক বিল্ডিং ডিজাইন এন্ড কনসালটেন্ট নামক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় পুত্র, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্স বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে বর্তমানে আমেরিকায় স্বপরিবারে বসবাস করছেন। ছোট ছেলে ইলেক্টিট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন। বলা যায় কবি মো. আবদুল হাই বক্তিগত জীবনে একজন সফল ব্যক্তি।

কবিতা কি এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা, সমালোচনা এবং মতাদর্শ। আমি বলি হৃদয় তরঙ্গের ছোঁয়ায় আঁকা শাব্দিক এবং শৈল্পিক আলপনাই কবিতা। কবিতা নদীর ঢেউয়ের মতো গতিময়, অনন্ত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে বহমান। কবিতায় চূড়ান্ত বলে কিছু হয় না। আধুনিক কবিতা ঠিক ব্ল্যাকহোলের মতো, রহস্যে ঘেরা জটিল। সর্বজনগ্রাহ্য কবিতার সংজ্ঞা পাওয়া সত্যিই কঠিন। বিভিন্নজনের কাছে কবিতা বিভিন্ন রকম। বোধের পার্থক্যও স্পষ্ট এবং এটাই বাস্তবতা; আর এজন্যই কবিতা নিরন্তর সৌন্দর্য সাধনার অনিঃশেষ খোরাক। সময়ের ব্যবধানে, জাগতিক বৈচিত্র্যে, বাস্তবতা ও পরিবেশের রকম ফেরে কবিতা নানাবিধ ডালপালা মেলে যেন রহস্যবৃক্ষ। সৌন্দর্য সম্পর্কে যেমন চূড়ান্ত কিছু হয় না, কবিতা সম্পর্কেও ঠিক শেষ কথা বলা যায় না। সময় যেমন পরিবর্তনশীল, সময়ের সাথে সাথে কবিমন, কবিতা, কবিতার ভাষা, শব্দচয়ন, অঙ্গসৌষ্ঠব ও ভাবের বিন্যাসও সেরকম পরিবর্তশীল। কবিতা কখনোই আধুনিক, পুনরাধুনিক বা উত্তরাধুনিক হয় না। আধুনিক বা পুনরাধুনিক হয় কবিতার ভাষা, তার শব্দগঠন ও বিষয়ানুযায়ী সময়ের প্রেক্ষাপট। এ বিবেচনায় কবি মো. আবদুল হাই তাঁর নিজস্ব কাব্য ভাষাশৈলি তৈরি করতে পেরেছেন কিনা এ কথা সময়ই বলবে হয়তো।

বলা হয়ে থাকে, যে কোনো স্তরের শিল্পকর্ম বা সাহিত্যকর্ম বা যে কোনো পর্যায়ের শিল্পীর জন্যে অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে নিজের শ্রেণিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং নিজেকে নিজের লোকালয়ের জনগণের সাথে মিশিয়ে ফেলা; তবে এই মিশ্রণের সময় শিল্পীকে আবশ্যিকভাবে স্মরণ রাখতে হয় সময় ও বাস্তবতাকে, স্মরণ রাখতে হয় শিল্পীর মস্তিস্ক্যের সক্ষমতাকে, নিজের সেরেব্রাল কোটেক্টকে। কারণ মনে রাখতে না পারলে বড় ভুলে তিনি ভুলেই যান যে, তিনি তার জনতারই অংশমাত্র। ফলে শিল্পী মনের অজান্তেই সরে যান মূল থেকে। এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে, জনাংশের ভগ্নাংশ হতে না পারলে একজন মননশীল ব্যক্তি, শিল্পী বা সাহিত্যিক তাঁর সাবলিমিটির চূড়াকে স্পর্শ করতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্পর্শ তো দূরের কথা অনুভূতির এককও নির্মান করতে পারেন না। ফলে তা নিতান্তই হৃদকথায় পরিণত হয়। এখানে এ কথাও মনে রাখতে হবে একজন শিল্পীকে যাবতীয় হঠকারীতা এবং সুবিধাবাদ হতে যোজন-ফ্যাদম দূরে অবস্থান করতে হয় এবং করা উচিত, না হলে আত্মমগ্নতা এবং বাস্তবতার মাঝে সৃষ্ট হয় কিংবা ধরে ভয়াবহ ফাটল। আর এ ফাটল শিল্পীকে ধ্বংস করে, কারণ রচনা নির্মাণকালীন শিল্পীর কাছে আত্মমগ্নতাই প্রবল হয়ে ওঠে। এই আত্মমগ্নতার সময়ই হলো তার নির্মাণের উপযুক্ত সময়। এই সময় তার জ্ঞান বাস্তুচ্যুত হলেই সর্বনাশ, যেমনটা আমরা অহরহ দেখছি। এক্ষেত্রে নিংসন্দেহে কবি মো. আবদুল হাই দিনাজপুরের মত রাজধানী থেকে দূরবর্তী একটি মফস্বল শহরে থেকে যথার্থ করেই নির্মাণ করেছেন তার কবিতা।

কবি মো. আব্দুল হাই পেয়েছেন ‘প্রণয় পালকি কবিতাগ্রন্থের জন্য কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি) কর্তৃক ‘মানবাধিকার সম্মননা-২০২১। পেয়েছেন ও ঈধহ আমি পারি নেটওয়ার্ক কর্তৃক লেখালেখির জন্য ‘চেঞ্জমেকার এ্যাওয়ার্ড-২০২১; পেয়েছেন বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন ও সিডিসি কর্তৃক ‘পরিবেশ বন্ধু সম্মাননা-২০২২ এবং দিনাজপুর লেখক পরিষদ কর্তৃক সাংগঠনিক অবদানের জন্য ‘বিশেষ সম্মাননা-২০২৩। এছাড়াও তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দিনাজপুরের প্রাচীন সাহিত্য সংগঠন উত্তর তরঙ্গ সাহিত্য পরিষদ এবং সহসভাপতি হিসেবে যুক্ত আছেন দিনাজপুর লেখক পরিষদ এ। এছাড়াও দিনাজপুরের প্রবীণ সাহিত্যকর্মী ও সংগঠক হিসেবে সরব থেকে সাহিত্য সাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত করে আছেন। কবি উঠে এসেছেন গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধমেখে, তাই তো তাঁর কবিতায় এ মাটির গন্ধ আমরা দেখতে পাই। যদিও তাঁর কবিতায় ভাষা ও নির্মাণে প্রাচীনত্বের আবহে নির্মিত গঠনশৈলী আমরা দেখি। কবিতা হয়েছে কি হয়নি সেই প্রসঙ্গে না গিয়েই বলা যায়, কবিতার এই বিচার হয়তো সময়েই নির্মাণ করবে। কবি মো. আবদুল হাই কবি হিসেবে বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যের পথ-পরিক্রমায়, এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি। কবির দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

চলতে চলতে আমরা চলার পথকে চিনতে পারি, চলার পথকে আবিষ্কার করি। আবার নিজের চলার পথকেও নির্মাণ করতে পারি। তেমন ভাবেই কবি মো. আবদুল হাইকে আমার চেনা এবং তাঁর চলার সাথী হয়ে ওঠা। এভাবেই কোনো এক সময় তাঁকে উৎসর্গ করে লেখা হয় আমার কবিতা-গান ও প্রবন্ধ। কবি মো. আবদুল হাইকে নিয়ে আমার অনেকগুলো লেখা থেকে এখানে দুটি বিশেষ কবিতা সন্নিবেশিত করা হলো-

কিছুক্ষণ ছিলাম বেগুনিতে
ওপারে ধূসর ছায়াপথ
আমি পাড়ি দেই সকাল-সন্ধ্যা-রাত মধ্য প্রহর
প্রেমের সলতে জে¦লে জেগে তুলি বুধ-বুহস্পতি-শুক্র
জেগে তুলি কুসুম-কুসুমিত পরাগ
রক্তাভ আভায় গনগনে ভরা দুপুর;
নুড়িতে রিনঝিন শব্দ নুপুরের ছন্দে
সাগরের নীল ছুঁয়ে;
ঢেউয়ের পর ঢেউ;
আমি বেঁধে চলি কিছুক্ষণ
নিঃশ্বাসে নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

অন্তরধান হয়ে বুকের ভিতর
থকথকে কাদায় জেগে তোলে অমরা চাঁদ
অন্তরলোক বেঁচে তোলে স্পর্শ-অতল লীন
ঘুটঘুটে অন্ধকারে ধবধবে ওড়নায় ছিটায় আতর।
গোলাবী ফর্সা সন্ধ্যায়-
আমিও গা ঘেঁষে মাতম করি
অতলস্পর্শী সুর-লয়-তাল।

অতঃপর ফিরে আসে বিকেল
ধূ ধূ দুপুর শিশির জল
ধূলো মাখা পায়ে ফেটে যায় গোড়ালি-তারপর,
তারপর অতলস্পর্শ হয়ে জেগে যায় নাড়াপোড়া রাত;
আমি নিঃশব্দে ছিঁড়তে থাকি
একটা একটা করে-বুকের পরত।

অতঃপর-অন্তরধানে কিছুক্ষণ
আমি হয়ে উঠি ঈশ্বর
তারপর শুধুই অতপর-
থেমে থেমে ডেকে যায় সন্ন্যাস চর।
(অতপর কিছুক্ষণ ॥ চাষা হাবিব)
মার্চ ১৪, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ, দিনাজপুর।

পড়ুন: প্রবন্ধ রুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি

আবারও কোন এক বেদনার্ত দুপুরে লেখা হয়-

শূন্যতার গভীরে গহীন শূন্যতা
বেড়ে চলে অন্ধকার, যখোনে আলোর নাচন
মে নেয় পরাজয় মধ্যহ্ন প্রহরওে বিবাদী সমন;
ধূসর গোধূলি নামে ভরা ধানক্ষেতে
আমি হেটে চলি ধূ ধূ পথ;
সামনে গহন প্রান্তর যখোনে
কোষ চক্র বৃদ্ধ হয় সমযানে;
অথচ সুফলা সময়ে যে শরীর ছুয়ে ছলি দগিন্ত
আজ শুধুই শূন্যতা; গভীর শূন্যতা যনে সর্মাপন
পরাজতি আলোর দয়োল লেপে দেয় দেহভাঁজ।
সকালরে শশিরি ধোওয়া র্দূবাদল;
দুপুররে খরতাপে পুষ্ট সোনা রোদ;
বকিলেরে মষ্টিতা সবশেষে জুড়ে দয়ো বৃদ্ধ স্বর
শূন্যতা অসীম শূন্যতায় জরাগ্রস্ত ভগ্নাংশ শরীর।
আমি হেটে চলি একাকী শূন্য ধূ ধূ পথ…
(শূন্যতায় শূন্য ॥ চাষা হাববি)
এপ্রিল ১৭, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ, দিনাজপুর।

কবি মো. আবদুল হাই তথাকথিত একাডেমিক কাব্যভাবনাকে তোয়াক্কা না করেই একান্ত ব্যক্তিগত তাড়না থেকে কাব্যচর্চা করে চলেছেন আজীবন, এ জন্য তাঁকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। তাঁর এসব সৃজন কর্ম গ্রন্থাকারে প্রকাশের উদ্যোগ আরো বেশি আশা জাগানিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থটির ব্যাপক প্রসার ও প্রচারের কামনা করছি।

চাষা হাবিব
কবি ও গবেষক
সম্পাদক- ‘বাহে’ সাহিত্যপত্রিকা

সূত্র:
মুখবন্ধ: কিছুক্ষণ অতঃপর- মো. আবদুল হাই, জিরোকিলোমিটার, জুলাই ২০২৪, ঢাকা।

Chasa Habib
Chasa Habibhttp://chasahabib.com
Chasa Habib, a Bangladeshi poet, writer and a researcher writing in Bengali language. More than 12 books are published.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments