ইতিহাস ঐতিহ্যে আমবাড়ি হাট
চাষা হাবিব
পড়ুন প্রবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গ্রামায়ণ
বরেন্দ্রের উত্তরমুখ খ্যাত দিনাজপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা। ভাত সভ্যতা বা করতোয়া সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এই দিনাজপুর জেলা। দিনাজপুরের কৃষিকেন্দ্রিক লোকজ জীবন ধারায় গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হলো হাট, যাকে অধূনা বাজার নামেই বলা হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ তার প্রয়োজনে উৎপাদন কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে এবং নিজের প্রয়োজনের তাগিদে উৎপাদিত পণ্যের বিনিময় প্রক্রিয়া আবিস্কার করেছে, ফলে এইসব পণ্যের বিনিময়ের জন্যই সুনিদ্দিষ্ট স্থানে তারা সপ্তাহের নিদ্দিষ্ট দিনে একত্রিত হয়ে নিজেদের পণ্য অপরের সঙ্গে বিনিময় করা শুরু করে, সেই থেকেই হাট–হাটি বা আজকের বাজার যে নামেই ডাকি না কেন তার উৎপত্তি। বাংলাদেশের এমন কোন জনপদ নেই যেখানে সাপ্তাহিক হাট–হাটি কিংবা বাজারের ব্যবস্থা প্রচলিত নেই। এরই প্রতœধারাবাহিকতায় দিনাজপুরের বিখ্যাত ও অন্যতম বৃহৎ আমবাড়ি হাটের জন্ম। যা, মূলত ধানের বেচাকেনা এবং পশুর হাট (স্থানীয়রা একে আামবাড়ি গরুরহাট বলেন) নামেই দেশব্যাপি পরিচিত।
আমবাড়ি হাটের জন্মকথা
ঠিক কবে থেকে এই হাটের জন্ম তা বলা না গেলেও আমবাড়ি হাটটি যে প্রাচীন তা প্রমাণ করে এই অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান ও পারিপাশির্^ক জনপদসমূহের প্রাচীনত্ত্বের উপর। আমবাড়ি হাটটি প্রাচীন ও পৌরাণিক ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত। এর পাশেই রয়েছে মজে যাওয়া প্রাচীন খাত টুপিদহ বিল। ভারতের ছোট নাগপুর, বিন্ধ্যা পর্বত প্রভৃতি লাখ লাখ বছরের প্রাচীন স্থানগুলোর মৃত্তিকার সমগোত্রীয় দিনাজপুরের এ অঞ্চলের মাটি১। বহুকাল পূর্বে হিমালয় পর্বতের ভগ্নীরূপে জন্ম নেয়া বরেন্দ্র ভূমির হৃদয়–স্থানীয় স্থান দিনাজপুর। চৈনিক ও ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের বিবরণীতে বৃহৎ ও সুনাব্য নদীরূপে বর্ণিত করতোয়া নদীর তীরে কোন এক অজ্ঞাত সময় থেকে এক উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। করতোয়ার তীরে গড়ে উঠে বলে একে করতোয়া সভ্যতা হিসেবে অভিহিত করা হয়, আবার একে ভাত সভ্যতা হিসেবেও অনেক ঐতিহাসিক অভিহিত করা থাকেন২। বলা হয়, দিনাজপুর একটি পৌরাণিক জনপদ। আত্রাই–জম্বু–করতোয়া–ইছামতির অববাহিকায় অবস্থিত এ সভ্যতার বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষগুলির মধ্যে দামোদরপুর৩ (দামোদরগুপ্তের সময়ের ৩টি মুদ্রা এখানেই পাওয়া গিয়েছিল) আমবাড়ি হাট থেকে দক্ষিণে ২ কিমি দুরত্বের মধ্যেই অবিস্থিত। আবার পুখুরি ও শালগ্রাম নগরীর ধ্বংসাবশেষও এই হাট থেকে দক্ষিণ সীমায় ১০ কিমি দুরুত্বের মধ্যেই অবস্থিত। আবার প্রাচীন ইছামতির এই পথেই বিখ্যাত চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যতরী যেত। আমবাড়ি হাটের দক্ষিণ অনতি দূরেই পানিকাটা ও গোয়ালঘাট অবস্থিত। ফলে একথা নির্দিধায় বলা যায় ইছামতি নদীর তীরে আমবাড়ি হাট কোন এক অত্যায়িককালেই জন্ম নিয়ে আজও সগৌরবে চলছে সম্মৃদ্ধির পথে। তাই তো লোকশিল্প ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই অঞ্চলের প্রাচীন শোলক্য সাহিত্যে বলা হয়–
চাল চিড়া চট গুড়
এই নিয়ে দিনাজপুর৪।
আর এইসব লোকজ পণ্যের পসরাকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতেই যেন সম্মৃদ্ধ রূপায়নের আখেল্য আজকের এই আমবাড়ি হাট।
নামকরণ, অবস্থান ও আয়তন
আমবাড়ি হাট স্থানটি পার্বতীপুর উপজেলার ৭নং মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ছোট রামচন্দ্রপুর মৌজায় অবস্থিত। ফুলবাড়ি–দিনাজপুর মহাসড়কের উপরে পার্বতীপুর–চিচিরবন্দর–ফুলবাড়ি উপজেলার ত্রি–সীমানায় হাটটি স্থাপিত। চিরিরবন্দর উপজেলার ১০নং পুনট্রি ইউনিয়নের শেষ প্রান্ত দৌলতপুর, ফুলবাড়ি উপজেলার ১নং এলুয়াড়ির ইউনিয়নের উত্তর–পশ্চিম প্রান্ত দাঁড়াপাড়া এবং ৭নং মোস্তফাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ–পশ্চিম প্রান্তের ছোট রামচন্দ্রপুর মৌজা ও বালুপাড়ায় আমবাড়ি হাটটি অবস্থিত। মৌজার নাম থেকেই এই হাটের নামকরণ৫। এলাকার সামন্ত জোতদার কিংবা রেয়াতি জমিদার রামচন্দ্রের বাড়ি বা রামবাড়ি থেকেই আমবাড়ি শব্দের উৎপত্তি। এখানে উল্লেখ্য যে পার্বতীপুর–ফুলবাড়ি অঞ্চলের মানুষজন ‘র’ বর্ণের উচ্চারণ ‘অ’ বর্ণের মতো করে উচ্চারণ করেন। যেমন রফিককে অফিক কিংবা রংপুরকে অংপুর বলে উচ্চারণ করেন। সেই মতে রামবাড়িই উচ্চারণের বিপর্যয়ে আমবাড়িতে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে দিনাজপুরের এ অঞ্চলের উপভাষার গঠন বিশ্লেষণে স্বরধ্বনির পরিবর্তন দেখা যায়৬–
- ভাষায়শব্দেরআদি ‘অ’,‘আ’, ‘ঈ’, ‘উ’, ‘ঊ’ ‘ও’ ধ্বনি ‘র’–এরসাথেযুক্তথাকলে ‘র’ ধ্বনিলোপ পেয়ে সংশ্লিষ্ট স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়।যেমন : রসি> অসি, রানু> আনু, রুটি > উটি, রূপবান> উপবান, রোগ> ওগইত্যাদি।
- শব্দের আদি অ> আ ধ্বনিতে পরিবর্তন।যেমন : কথা> কাথা, গলা> গালা ইত্যাদি।কখনও কখনও অ>ও হয়। যেমন : মশা> মোশা, শসা> শোসা, বল> বোল, বস্তা> বোস্তা ইত্যাদি।আবার শব্দের আদিতে ‘আ’এবং ‘ও’ ধ্বনি লোপ পেয়ে ‘অ’ তে পরিণত হয়।যেমন : কাঁঠাল> কঠল, পাখি> পখি, পোকা> পকা, সোনা> সনা, গোসাই> গসাই ইত্যাদি।
- আবার উপর্যুক্ত স্বরধ্বনিগুলোর যদি কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি যুক্ত না থাকে এবং ওই স্বরগুলো একাকী শব্দের আদিতে থাকে তবে তাদের উচ্চারণ ‘র’-এর মতো হয়।যেমন: আম> রাম, ওঝা > রোঝা, ঔষদ> রৌষদ ইত্যাদি।
এ থেকে স্পষ্টই বলা যায় আমবাড়ি শব্দটি রামবাড়ি শব্দের পরিবর্তিত রূপ। তবে আমবাড়ি হাটের নামকরণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি মত প্রচলিত। বলা হয়, দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপনের জন্য জনৈক সরকারি কর্মবর্তা ঢাকা থেকে এখানে তদন্তে আসলে, তিনি স্থানীয়দের এ জায়গার নাম প্রসঙ্গে বললে তারা ছোট রামচন্দ্রপুর বলেন, হিন্দু নাম হওয়ায় পাকিস্তানি এই কর্মকর্তার এ নাম মনোপুত না হওয়ায় তিনি যেহেতু আম গাছের ছায়ায় বসেছিলেন তাই তিনি এ স্থানের নাম আমবাড়ি বলে কাগজে লেখেন, সেই থেকে এটি আমবাড়ি বলে প্রচলিত৭। আমবাড়ির সন্নিকটে বিশ^নাথপুরে (হাতির গেইট খ্যাত) বিখ্যাত বণিক পরিবার শাহ’দের বসবাস। তারাও অতীতে ব্যবসার কাজে অত্র এলাকায় এসে পরে এখানেই স্থায়ী হন, এবং আমবাড়ি হাটের শ্রী বৃদ্ধিতেও রয়েছে তাদের অবদান। সরকারিভাবে আমবাড়ি হাটটি ৬.২৯ একরের ১৫টি চান্দিনা ভিটির উপর বসলেও বর্তমানে এ হাটের আয়তন ৩০০ একরের উপর৮। এছাড়া ফুলবাড়ি–দিনাজপুর মহাসড়কের উভয় পাশের্^ আমবাড়ি হাটটি প্রায় ২কিলোমিটার ব্যাপি লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত।
আমবাড়ি হাট অর্থনীতি
আমবাড়ি হাট উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ হাট হিসেবে পরিচিত। প্রায় তিন হাজার স্থায়ী–অস্তায়ী দোকান হাটের দিন বসে। সপ্তাহে দুইদিন শুক্র ও সোমবার আমবাড়ি হাট বসে। গত ২০২৩–২৪ অর্থ বছরে এই হাটের ইজারা মূল্য ছিল ৭,৩৯,৭৪,২২০ টাকা৯। এ থেকেই বোঝা যায় আমবাড়ি হাটের আর্থ–সামাজিক মূল্য কতটুকু। প্রকা– এক বট গাছের নিচে মাত্র কটি দোকান নিয়ে আমবাড়ি হাট শুরু হলেও বর্তমানে এটি দিনাজপুরের সর্ববৃহৎ গ্রামীণ হাটে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা আসেন এই হাটে। আমবাড়ি হাট বর্তমানে পশু কেনাবেচার অন্যতম হার্বে পরিণত হয়েছে। এখান থেকেই পশু বোঝাই ট্রাক রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। সোমবারে এ হাটে ৮০০–১০০০ গোরু এবং কয়েক ’শ অন্যান্য গবাদিপশুর বেচাবিক্রি হলেও শুক্রবারের হাটে শুধু গোরু বিক্রিই ১৫০০–২০০০ টিতে উন্নীত হয়১০। এছাড়া ছাগল, ভেড়া, হাস–মুরগী, কবুতর, খরগোশ প্রভৃতিও শতশত সংখ্যায় বিক্রি হয়। আমবাড়ি হাটকে কেন্দ্র করে এতদ্বাঞ্চলে এবং ফুলবাড়ি–চিরিরবন্দর–পার্বতীপুর সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এই হাট কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের সূচনা করেছে। অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এই আমবাড়ি হাট, যা এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে এই হাটে পশু কেনাবেচা সহ ধান ক্রয়–বিক্রয়ে অন্যতম মোকামে পরিণত হয়েছে। ফলে এখানে গোডাউনসহ বেশকটি অটো রাইস মিল গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গমনের জন্য গড়ে উঠেছে আন্তঃজেলা বাস ও ট্রাক স্ট্যান্ড এবং সার্ভিস কাউন্টার। এছাড়া আধুনিক বিপনীবিতান সহ নামী কোম্পানির একাধিক সুবিশাল বিক্রয়কেন্দ্র। ফলে হাটবার ছাড়াও পুরো সপ্তাহ জুড়েই আমবাড়ি হাট এখন এই অঞ্চলের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। হাটবারে গড়ে ১৫০–২০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়১১। এছাড়া প্রতিদিনই কয়েক কোটির টাকার লেনদেন ঘটে আমবাড়ি হাটে। হাটকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে অস্থায়ী কেনাবেচার খাড়া হাটি। এখানে সরকারি জনতা ও কৃষি ব্যাংক শাখা এবং বেসরকারি ব্র্যাক ও ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শাখা সহ এটিএম বুথ, বিমা কোম্পানির একাধিক শাখাসহ গড়ে উঠেছে আর্থিক লগ্নিকারী সরকারি–বেসরকারি ও এনজিও প্রতিষ্ঠান। আমবাড়ি হাটটি কয়েকটি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত। যেমন– গরু হাটি, ছাগল হাটি, খাড়া হাটি, ধান হাটি, পান হাটি, মাছ–গোস্ত হাটি, তরকারি হাটি, দুধ হাটি, খড় হাটি প্রভৃতি।
আমবাড়ি হাটে লোকজ ও কৃষিজ শিল্পপণ্য
দিনাজপুরের মানুষের জীবনযাত্রা কৃষি নির্ভর এবং তাদের প্রাথমিক আয়ের উৎস কৃষিভিত্তিক। বেশীরভাগ কৃষিজমি অল্প কিছু লোকের মালিকানায়, ফলে বেশীরভাগ মানুষ কৃষিশ্রমিক। তাই এ জেলার লোকশিল্প ও কারুশিল্পের বিকাশ ঘটেছে কৃষি এবং কৃষিজ জীবনধারা থেকেই। মুলত বাঙালি হিন্দু, মুসলিম, সাঁওতাল, কড়া, কোচ, ওরাঁও, মেচ, রাজবংশী (পলিয়া), তুরি, মুন্ডা, পাহান, মালাকার, মশহুর–সহ বহু জনজাতির বাস এ জেলায়। প্রতিটি লোকসমাজে প্রচলিত রয়েছে তাঁদের নিজস্ব লোকাচার–লোকশিল্প, গান, নাচ ও উৎসব। বহুধারার মানুষের মিলনক্ষেত্র হয়ে যুগ–যুগান্তর ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ এখানে এসে বসতি গড়েছে, ফলে নবাগত মানুষ পুরনো অধিবাসীদের সাথে মিশে এখানে এক অভিনব সঙ্কর জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটিয়েছে। এ জেলায় ১৭টি ক্ষুদ্র নৃ–জনগোষ্ঠী বসবাস১২। এরা জাতিতাত্ত্বিকভাবে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক, বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে স্বকীয়। এসব জনগোষ্ঠির লোকজ শিল্পকর্ম দেশ–বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে। শোলা, কার্পেট, টেরাকোটা, বাঁশের তৈরি কারুশিল্প, কাঠের তৈরি মুখোশ, পুতুল, পাট থেকে নির্মিত ধোকরা শিল্প, কলাগাছের তন্তÍশিল্প এখানে সমৃদ্ধ। আর এসব লোকজ পণ্যের বেনাবেচার অন্যতম মোকাম এই আমবাড়ি হাট।
তাঁত ও তন্তু শিল্প
দিনাজপুরের তাঁত ও কলাগাছের তন্তÍশিল্পের ঐতিহ্য এবং পাট থেকে নির্মিত ধোকরা শিল্প সর্বজনবিদিত। তবে সম্প্রতি দিনাজপুরের এ শিল্পটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবুও কতিপয় মহান শিল্পী এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া লুঙ্গি, গামছা সহ কাপড় ও পোষাক কেনাবেচার অন্যতম হাট এই আমবাড়ি।
নকশি কাঁথা
নকশি কাঁথা দিনাজপুর তথা বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পের ঐতিহ্যমন্ডিত ও নান্দনিক নিদর্শন। পুরনো কাপড়ের কাঁথা সেলাই করে তার ওপর গ্রামবাংলার নারীরা বিভিন্ন নকশা তোলেন–একেই বলে নকশি কাঁথা। এই নকশি কাঁথায় জড়িয়ে থাকে অনেক সুখ–দুঃখের স্মৃতি। এসব নকশি কাঁথার ব্যবহার ভেদে বিভিন্ন নামও রয়েছে। যেমন– গায়ে দেয়ার কাঁথা, বিছানার কাঁথা, শিশুর কাঁথা, সুজনী কাঁথা, বর্তনী রুমাল কাঁথা, পালকর কাঁথা, বালিশের ঢাকনি, দস্তরখানা, পান পেঁচানী, আরশীলতা প্রভৃতি১৩। সম্প্রতি দিনাজপুরের অনেক নারী উদ্যোক্তা এ শিল্প বিকাশে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছে।
শিকাশিল্প
শিকাশিল্প পাটের ভূমি খ্যাত দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প। পাট হচ্ছে শিকা তৈরির প্রধান উপকরণ। তবে নকশি শিকা তৈরিতে বাঁশের কঞ্চি, সুতলি, ঝিনুক, কড়ি, শঙ্খ, কাপড়, পোড়ামাটির বল ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়। বইপত্র, কাঁথা–বালিশ, শিশি–বোতল, বাসনপত্র, পাতিল–কলসি, আয়না–চিরুনি এসব সর্বত্রই বিভিন্ন সাইজের শিকা তৈরি করেন দিনাজপুরের গ্রামীণ নারীরা। শিকার ব্যবহার বর্তমানে কমলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। গ্রামীন নারীদের তৈরি নকশি শিকার অসংখ্য নাম রয়েছে। যেমন– উল্টাবেড়ী, ফুলটুংগী, রসুন দানা, আংটিবেড়, ফুলমালা, ডালিম বেড়, ফুলচাং, গানজা ইত্যাদি১৪। পাট দিয়ে ঐতিহ্যবাহী শিকা তৈরির পাশাপাশি আজকাল পাটের তৈরি টেবিল ম্যাট, মানি ব্যাগ, ফ্লোর ব্যাগ, নেট, প্লেটম্যাট, লেডিস ব্যাগ, দেয়াল সজ্জা ও গৃহসজ্জারও রকমারি সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। এসব সামগ্রী আমবাড়ি হাটসহ দেশ–বিদেশে সমানভাবে সমাদৃত হচ্ছে।
নকশি পিঠা ও মিঠাই
নকশি পিঠায় দিনাজপুরের রয়েছে ঐতিহ্য। বিশেষ করে পূজা–পার্বন, উৎসব এবং মেলাকে ঘিরে এ পিঠা ও মিঠাইয়ের বাজার অনেক বড়। বিভিন্ন সাইজ এবং বাহারি নামের নকশি পিঠা এবং মিঠাই গ্রামীন নারীরা আদিকাল থেকেই তৈরি করে আসছেন। ভাঁপা, পুলি, সমশা, অন্বেষা, চিতই, গড়গড়িয়া, পোয়া, পাটিসাপটা এবং কলইয়ের পিঠা প্রভৃতি অন্যতম এবং বাতাসা, মন্ডা, খাজা, কদম প্রভৃতি মিঠাই হিসেবে বহুল প্রচলিত। আমাবাড়ি হাটের গুড়ের জিলাপীর সুনাম দেশব্যাপি।
নকশি পাখা
দিনাজপুরের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যের আরেক প্রতীক হচ্ছে নকশি পাখা। তালপাতা, সুপারীর পাতা ও খোল, সুতা, পুরনো কাপড়, বাঁশের বেতি, নারিকেল পাতা, চুলের ফিতা, পাখির পালক ইত্যাদি অতি সাধারণ ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে পাখা তৈরি করা হয়। গ্রীষ্মকালে শরীর ঠান্ডা করার জন্য নকশি হাতপাখার ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্যনীয়। এসব নকশি পাখার রয়েছে বাহারি নাম– যেমন বাঘাবন্দী, শঙ্খলতা, কাঞ্চনমালা, সজনে ফুল ইত্যাদি১৫। এক সময় বর, বধূ ও তাদের সঙ্গে আসা মেহমানদের বড় সাইজের তালপাতার হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা ছিল এ অঞ্চলের ঐতিহ্য। এই পাখা আমবাড়ি হাট হয়ে দেশের সর্বত্র সরবরাহ হয়।
মৃৎশিল্প
দিনাজপুরের লোক ও কারুশিল্পে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে মৃৎশিল্প। এ শিল্পের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। এ শিল্পকে ঘিরে গ্রামবাংলার অনেক পরিবার জীবন–জীবিকাও নির্বাহ করে। দিনাজপুর জেলার মৃৎ শিল্পীরা ঐতিহ্যগতভাবে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে আসছে। ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্পসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে হাঁড়ি–পাতিল, কলসি, সানকি, চুলা, বাটনা, শাক–সবজি, ফলমূল, খেলনা, পুতুল, ঘরের টালি, পানি সেচের নালি, ধর্মীয় প্রতিকৃতি, প্রাণীজ প্রতিকৃতি, অলঙ্কার প্রভৃতি। আমবাড়ি হাটসহ দিনাজপুরের প্রায় সকল গ্রামীণ হাটবাজার এবং শহর–বন্দরে এসব মাটির এসব জিনিসপত্র পাওয়া যায়।
নকশি ছাঁচ
লোকশিল্পকলার একটি স্থায়ী ফর্ম নকশি ছাঁচ। যা দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। মাটি, পাথর অথবা কাঠ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের ছাঁচ তৈরি করা হয়। এ ছাঁচে ফেলে বস্তুকে বিভিন্ন আকৃতিতে রূপদান করা হয়। কাঠের নকশা করা ছাঁচে রং লাগিয়ে কাপড় ও কাঁথা ছাপানো হয়। কাঠ, মাটি ও পাথরের ছাঁচে মিঠাই, ক্ষীর, আমসত্ত্ব, গুড়ের পাটালি, স্যানিটারি সামগ্রী ইত্যাদি তৈরি করা হয়১৬। বিশেষত আমবাড়ি হাটের দিন এবং দিনাজপুরের বিভিন্ন মেলাকে কেন্দ্র করে পূজো ও বৈশাখী উৎসবে এ শিল্পের প্রসার লক্ষ্য করা যায়।
চিড়া
দিনাজপুরের চিড়ার সুখ্যাতি দেশব্যাপি। প্রাচীনকাল থেকেই চিড়া এ অঞ্চলের মানুষের তৃপ্তিকর খাবার হিসেবে চিড়া, চিড়ার নাড়–, চিড়ার জলপান (দই, চিড়া, গুড়) প্রভৃতি প্রচলিত। বর্তমানে ঢেঁকিতে এবং মেশিনে দুই প্রকারের চিড়া বাজারজাত হচ্ছে। সুগন্ধি কাটারি ধান এবং বিআর ২৮ ধানের চিড়া সমধিক প্রচলিত। আমবাড়ি হাটে সব রকমের চিড়াই পাওয়া যায়।
মুড়ি–খই–মোওয়া–মুড়কি
চালের জন্য বিখ্যাত দিনাজপুরের লোকশিল্প হিসেবে মুড়ি এবং খই দেশের গন্ডি পেরিয়ে আজ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। একমসয় সিলকুমোর ও মাগুরশাইল ধানের খই মুড়ির বেশ সুখ্যাতি ছিল১৭। বর্তমানে চিকন ও সুগন্ধি ধানের খই–মুড়ি–মুড়কি এবং মোওয়া লোকশিল্প হিসেবে টিকে আছে স্ব–মহিমায়। আমবাড়ি হাট থেকে এসব পণ্য দেশব্যাপি সরবরাহ করা হচ্ছে।
সিদল
দিনাজপুরের সিদল অত্যন্ত সুস্বাদু ও জনপ্রিয় একটি খাবার। প্রাচীন লোকজ প্রণালী মতে কচু শাক, সুঁটকি মাছ এবং নানাবিধ মসলার মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সিদল প্রস্তুত করা হয়১৮। সিদলের স্বাদ যে একবার পেয়েছেন সারাজীবনেই তা ভুলবেন না একথা জোর দিয়েই বলা যায়। এর বাজার মূল্যও বেশ আকর্ষনীয়। আমবাড়ি হাটের হোটেলের সিদল ভর্তা বেশ লোভনীয়।
ধানের খড় ও কাশ ঝাউয়ের বাড়–ন
দিনাজপুরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প নিদর্শন হচ্ছে ধানের খড় দিয়ে ও কাশ ঝাউয়ের তৈরি বাড়–ন। বিশেষ করে পাইজাম ধানের খড় দিয়ে এটি বোনা হয়। বর্তমানে এ ধান বিলুপ্তি হওয়ায় এবং আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার এ শিল্পকে প্রায় বিলুপ্ত করেছে। তবে আমবাড়ি হাটে কাশ ঝাউয়ের বাড়–ন এখনো বিক্রি হয়।
হাল–লাঙ্গল শিল্প
কৃষি কাজের জন্য আবশ্যকীয় উপাদান লাঙ্গল। সাধারণত কাঠ, বাঁশ. ঈশ বা লোহার ফলা এবং দড়ির ব্যবহার করে লাঙ্গল–জোয়াল এবং বলদ দিয়ে জমি চাষ করা হয়, যা এ অঞ্চলের আদিমতম একটি শিল্প বলে বিবেচিত। আমবাড়ি সহ দিনাজপুরের এমন কোন হাট নেই যেখানে চাষের এসব সামগ্রি বিক্রি না হয়। তবে সম্প্রতি আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার এ শিল্পকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে।
হাতে তৈরি রশি ও দড়ি শিল্প
এ অঞ্চলের মাটির বাড়ি নির্মাণ এবং কৃষিজ জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ হলো পাটের তৈরি দড়ি ও রশি। ফলে সেই প্রাচীন কাল হতেই দিনাজপুরে হাতে তৈরি রশি–দড়ি লোকশিল্পের বিকাশ লক্ষ্যনীয়। আজও যার ক্ষীয়মান ধারা প্রবাহিত। আধুনিক জীবনে এর ব্যবহার কমায় এ লোকশিল্পটিও বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে বিভিন্ন রকমের পাটের ও সিনথেটিক দড়ি আমবাড়ি হাটে পাওয়া যায়।
চুন ও খয়ের শিল্প
প্রাচীন কাল হতেই দিনাজপুরের কারিগররা ঝিনুক পুড়িয়ে পানের অন্যতম অনুসঙ্গ চুন প্রস্তুত করে আসছে। এছাড়া খয়ের গাছ থেকে খয়ের তৈরি করে আসছে, যা লোকজ পানশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ঢেঁকিছাঁটা চাল ও সুগন্ধি ধান
ধান কেন্দ্রিক জীবনে চাল তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকশিল্প। একসময় ঢেঁকিই ছিল চালের অন্যতম উৎস। ফলে দিনাজপুরে লোকশিল্প হিসেবে ঢেঁকিতে চাল বানানোকে অনেকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও এ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। সুগন্ধি ধান/চাল উৎপাদনে দিনাজপুর জেলা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ জেলায় নানাজাতের সুগন্ধি ধান জন্মে। তন্মধ্যে কাটারি, জিরাকাটারি (চিনিগুড়া), ফিলিপিন কাটারি, চল্লিশাজিরা, বাদশাভোগ, কালোজিরা, জটাকাটারি, চিনিকাটারি, বেগুনবিচি, ব্রিধান–৩৪, ও ব্রিধান–৫০ উল্লেখযোগ্য। একমাত্র ব্রিধান–৫০ রবি/বোরো মৌসুমে আবাদ হয়। অন্যান্য জাতের সুগন্ধি ধানগুলোর অধিকাংশ খরিপ–২/রোপা আমন মৌসুমে আবাদ হয়১৯। সুগন্ধি চালের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে– খেতে সুস্বাদু ও সুগন্ধময়। এগুলি বিভিন্ন জাতের, কোনটা খাটো, কোনটা লম্বা, কোনটা চিকন আবার কোনটা মোটা ও গোলাকৃতি। ধানকেন্দ্রিক লোকশিল্প আজও দিনাজপুরের অন্যতম শিল্প।
তেলি ও ময়রা শিল্প
কৃষিজ জীবনে উৎপাদিত তেলবীজ থেকে তেল প্রস্তুতে দিনাজপুরের তেলি শিল্পের বিকাশ। সাধারণত তেলের গাছ নামে পরিচিত এ তেল মাড়াইয়ের যন্ত্রটি যে গ্রামে বসানো হতো তা তেলিপাড়া নামেই পরিচিত হয়েছে। আবার দুধ থেকে মিষ্টি ও দুগ্ধজাত শিল্পের সুনামও দিনাজপুরে রয়েছে। আমবাড়ি হাটের বিশেষ ধরণের মিষ্টান্ন (বাতাসা, খাকড়াই, খাজা, ছানার জিলাপী প্রভৃতি) অতি জনপ্রিয়।
লোক ও কারুশিল্প
আয়তন ও বৈচিত্র্যের তুলনায় এ অঞ্চলের লোক ও কারুশিল্পের ভান্ডার অনেক বেশি সমৃদ্ধ। কারুশিল্পের বিশাল ভান্ডারে রয়েছে বাঁশের ডালা, ঝাঁটা, কুলা, দোন, ধামা, দাঁড়কিনি, সতরঞ্জি, ধাতব শিল্প, শঙ্খ শিল্প, দারুশিল্প, ঝিনুক শিল্প, পুতুল শিল্প, পিতল–কাঁসা শিল্প, বাঁশ–বেত শিল্প, শোলাশিল্প ইত্যাদি। এছাড়া নকশি পাখা, রুমাল, নকশি শিকা, শীতলপাটি, মাটির ফলকচিত্র, পাতা ও খড়ের জিনিস, লোকচিত্র প্রভৃতি দিনাজপুরের অন্যতম লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন যা এ হাটে বিক্রি হয়।
হাটবারের আহার–ভোজ
আমবাড়ির হাটবারে বিশেষ গোরুর ভুড়ি ভুনা, হাসের মাংস ভুনা, খিচুড়ি এবং বুটমুড়ি বিশেষ খাবার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে। হাটে আগত হাজার হাজার ক্রেতা বিক্রেতা এসব খাবার খেয়ে থাকেন, যা আমবাড়ি হাটের বিশেষ আকর্ষন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা–সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে আমবাড়ি হাট
আমবাড়ি হাট শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেই নিজেকে মেলে ধরেনি, সেই সঙ্গে এলাকার সামাজিক উন্নয়নেও রেখেছে অনন্য ভূমিকা। এই হাটেই স্থাপিত হয়েছে আমবাড়ি ডিগ্রী কলেজ (১৯৭৯), আমবাড়ি মহিলা কলেজ, আমবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, আমবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমবাড়ি ফাজিল মাদ্রাসা (১৯৮৮), আমবাড়ি এমদাদুল উলুম কওমী মাদ্রাসা, আমবাড়ি মহিলা মাদ্রাসা সহ এনজিও পরিচালিত ও বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল, যা এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এখানেই ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতে নির্মিত হয়েছে শহিদ মিনার, কেন্দ্রিয় ঈদগাহ ময়দান, কুড়িয়াইল মাজার শরিফ ও কুড়িয়াইল ফোরকানিয়া মাদ্রাসা সহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি সহ রয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক ও স্থানীয় সংগঠনের অফিস এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সহ সরকারি খাদ্য গুদাম। আমবাড়ি হাট একটি সম্মৃদ্ধ জনপদে পরিণত হয়ে দেশের আর্থ–সামাজিক উন্নয়নের রেখে চলেছে যুগান্তকারী ভূমিকা।
শেষকথা
একটি হাটের সাফল্য মানে একটি জনগোষ্ঠির আর্থ–সামাজিক সাফল্য। একটি হাটই একটি জনপদের আর্থ–সামজিক অবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারে তার অনন্য উদাহরণ আমবাড়ি হাট। আমবাড়ি হাটকে কেন্দ্র করেই অনেক পরিবার হয়েছে স্বচ্ছল। তাই আমবাড়ি হাট আজ পরিণত হয়েছে আমবাড়ি টাউনে। একটি উপজেলা শহরের রূপ পরিগ্রহ করেছে এই আমবাড়ি হাট। লোকজ ও গ্রামীণ জীবনের এই হাট আজ দিনাজপুরের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি জাতির গোষ্ঠী চরিত্র বহনকারী যে সমাজ থাকে, তারা তাদের বুদ্ধিমত্তা, নান্দনিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক বোধ দিয়ে লোক ও কারুশিল্প সৃষ্টি করে। এই ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিকে দেশজ সংস্কৃতি হিসেবে মানুষ চেনে। বাংলাদেশকে যে আবহমান ও চিরায়ত বাংলা বলা হয়, তার দৃশ্যমান নান্দনিকতা এর মধ্য দিয়ে পাওয়া যায়, তাই এর সংরক্ষণে এইসব লোকজ হাটসমূহকে আধুনিক সুবিধায় এনে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক জীবনের শিকড় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হবে। এই সব হাট–হাটি লোকশিল্প এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত সুস্পষ্ট সংস্কৃতির চিরায়ত রূপকে ধারণ করে। দিনাজপুরের কৃষিজ সমাজে ব্যবহারিক জীবনে অনেক বেশি কার্যকর এবং অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন এইসব সপ্তাহিক হাটের। এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে, কোনো দেশ বা জাতি যদি তার শেকড়ের কথা বলে বা সেই পরিচয় বহন করে, এমনকি জাতীয়তাবোধের পরিচয় বহন করতে চায়, তাহলে এগুলোর চর্চা খুবই জরুরি। গ্রামীণ বিকাশমান আমবাড়ির মতো হাটগুলো হয়ে উঠতে পারে সুষম, সাম্য ও ন্যায্য আর্থিক ও বাজার ব্যবস্থা বিকাশের প্রাণকেন্দ্র। হাট সংস্কৃতি আমাদের জাতীয়তাবোধের পরিচয় বহন করে, আমাদের মানসিক শক্তি দেয়, এগিয়ে যাবার প্রেরণা দান করে। দিনাজপুরসহ দেশের হাট–হাটি এবং লোক ও কারুশিল্প বাঁচলে আমরা বাঁচবো, বাংলাদেশ বাঁচবে।
তথ্যসূত্র :
- ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জান, দিনাজপুরের ইতিহাস, গতিধারা, এপ্রিল ২০১০, পৃষ্ঠা. ১৬–১৮
- মেহেরাব আলী, দিনাজপুরের ইতিহাস, ৫মখন্ড, ২০০২ (প্রথম পর্যায়)
- আবুল কালাম মোহাম্মদযা কারিয়া, দিনাজপুর মিউজিয়াম, নভেম্বর ১৯৮৯; পৃ. ২৫
- চাষা হাবিব, সাঁওতাল বিদ্রোহ ও দিনাজপুরের সাঁওতাল; ঊষারদুয়ার, ২০২২
- সাক্ষাৎকার : বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাউয়ুম, আমবাড়িহাট, তারিখ : ১৮ মে, ২০২৪
- চাষা হাবিব সম্পাদিত বাহে আলোকন সংখ্যা, মোজাম্মেল বিশ্বাস: দিনাজপুরের উপভাষার রূপবৈচিত্র্য; এপ্রিল ২০২৩
- সাক্ষাৎকার : নয়ন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক, মোস্তফাপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ, আমবাড়ি হাট, তারিখ : ২০ মে ২০২৪
- জেলা তথ্যবাতায়ন, দিনাজপুর জেলা : ৭নং মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পোর্টাল: আমবাড়ি হাট
- পূর্বোক্ত
- সাক্ষাৎকার : হাট ইজারাদার, আমবাড়ি হাটি, তারিখ : ২০ মে ২০২৪
- সাক্ষাৎকার : মো. আব্দুলমজিদ, সভাপতি, ৭নংমোস্তফাপুরইউনিয়নআওয়ামীলীগ, তারিখ : ১৯মে, ২০২৪
- চাষাহাবিব, কড়াসমতলেরবিপন্নআদিবাসীকড়া’রজীবনালেখ্য, সময়চিহ্ন, ঢাকা, ২০২০
- সাক্ষাৎকার; নুরনাহারবেগম, গ্রাম–দাদুল, ডাক–আটপুকুরহাট, ফুলবাড়ি, দিনাজপুর।তারিখ : ১৯মার্চ, ২০১৮
- সাক্ষাৎকার– নসিমনবেওয়া, গ্রাম–দাদুল, ডাক–আটপুকুরহাট, ফুলবাড়ি, দিনাজপুর।তারিখ : ১৯মার্চ, ২০১৮
- সাক্ষাৎকার–মাসুদাবেগম, গ্রাম–ফরক্কাবাদ (চাকপাড়া), ডাক– ফরক্কাবাদ, বিরল, দিনাজপুর।তারিখ : ২২মে, ২০১৮
- সাক্ষাৎকার– রুপালিরায়, গ্রাম– চিরিরবন্দর, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।তারিখ : ২৮মার্চ, ২০১৯
- সাক্ষাৎকার– মিজানুরনহমান, ধানব্যবসায়ী, আমবাড়িহাট।তারিখ : ১৯মে, ২০২৪
- সাক্ষাৎকার– তছলিমাবেগম, গ্রাম–ফরক্কাবাদ (চাকপাড়া), ডাক–ফরক্কাবাদ, বিরল, দিনাজপুর।তারিখ : ২২মে, ২০১৮
- সাক্ষাৎকার– কবিআমিনইসলাম, পুলহাট, দিনাজপুর, চালব্যবসায়ী, দিনাজপুর।তারিখ : ২২মে, ২০২০
কবি ও গবেষক
সম্পাদক- ‘বাহে’ সাহিত্যপত্রিকা;


