‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’
চলে গেলেন পদকর্তা কবি দাউদ হায়দার।
বিতর্ক নিয়েই কবির পথ চলা। কবি দাউদ হায়দার আধুনিক কবি যিনি সত্তর দশকের অন্যতম কবি হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে দাউদ হায়দার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে যান। ভাইভা বোর্ডে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়:
‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ — এটা কার কবিতা?
তিনি হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন: — আমারই লেখা। বোর্ডের শিক্ষকরা প্রথমে অবাক হয়েছিলেন, কী করে এমন একটি কবিতা এ বয়সের কোনো যুবক লিখতে পারেন। পরে অবশ্য তারা তার আগের কিছু লেখা দেখে তার প্রতিভা বুঝতে পারেন।
কবি দাউদ হায়দারের জন্ম ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, কি মিরাকল তাই না! তাইতো কী দুঃসাহসে কবি লেখেন-
‘আমার জন্যই তোমাদের এত দুঃখ
আহা দুঃখ
দুঃখরে!
আমিই পাপী, বুঝি তাই এ জন্মই আমার আজন্ম পাপ।’
কবি দাউদ হায়দার, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কবি, যাকে বিতর্কিত কবিতা লেখার জন্য দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৭৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়’ কবিতার জন্যই তাকে নির্বাসিত হতে হয়। তিনি ঐ কবিতায় গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রীষ্ট এবং হযরত মুহাম্মদ (স.) সম্পর্কিত মারাত্মক অবমাননাকর উক্তি করেন, যা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে প্রচণ্ড আঘাত হানে, যার ফল তার নির্বাসন।
দাউদ হায়দার প্রায় ৩০টির মতো বই লিখেছেন জার্মান, হিন্দি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জাপানি ও স্প্যানিশ ভাষায়। দাউদ হায়দারের কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনা, নির্বাসনের কষ্ট, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্বাধীনতা-চেতনা, দ্রোহ এবং মানবতাবাদী চেতনা প্রবলভাবে ফুটে ওঠে।
দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের পত্র পত্রিকায় সাহসী উচ্চারণে কলাম লিখেও তিনি জনপ্রিয়তা পান। কবি দাউদ হায়দারের সব ভাই-ই বিখ্যাত, সবাই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র পাবনার এই হায়দার পরিবার। জিয়া হায়দার বিখ্যাত লেখক, কবি, নাট্যকার, অনুবাদক ও অধ্যাপক। রশীদ হায়দার কথাসাহিত্যিক। মাকিদ হায়দার কবি। জীবিত আছেন কবি জাহিদ হায়দার ও আরিফ হায়দার নাট্যকার, বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলার অধ্যাপক। কবি দাউদ হায়দারের দেশে ফেরার প্রবল আকুতি ছিল। তিনি অপেক্ষার প্রহর গুণেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন একদিন সময় হবে পদ্মা ইচ্ছামতি গাঙ্গ শালিকের দেশে ফেরার। তা আর হলো না-
‘তোমার কথা’ কবিতায় দেশান্তরী হওয়ার গভীর বেদনার কথা কবি লিখেছেন বেদনার্ত অনুপ্রাসে:
মাঝে মাঝে মনে হয়
অসীমশূন্যেরভিতরেউড়েযাই।
মেঘের মতন ভেসে ভেসে, একবার
বাংলাদেশঘুরেআসি।
মনেহয়, মনুমেন্টেরচুড়োয়উঠে
চিৎকার করে
আকাশ ফাটিয়ে বলি:
দ্যাখো, সীমান্তের ওইপারে আমার ঘর
এইখানে আমি একা, ভিনদেশী। ‘
আসলেই মানুষ সব সময়ই একা।
চাষা হাবিব
২৬ এপ্রিল, ২০২৫, দিনাজপুর।

