১৯৭১: গণহত্যা- স্বীকৃতি ও শহিদের সংখ্যা বিতর্ক, প্রেক্ষিত দিনাজপুর জেলা
২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসেও ১৯৭১ সালে পৃথিবীর বর্বরতম গণহত্যার সঠিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন এখনো যেন সংশয়ে ফেলে আমাদের। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলের অন্যতম কর্ণধার নেতা থেকে শুরু করে অনেক মাথা মোটা সুশীল বিজ্ঞ জনেরাও মাঝে মাঝে সংশয় তুলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের্ ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন যা নতুন প্রজন্মের লেখক কিংবা ভাবুক মানুষ হিসেবে আমাকে ব্যথিত করে। একটা ধোঁয়াশা তৈরি করে বিরোধী দলের প্রধান নেত্রীও যেনো সে বিতর্কে ঘি ঢেলে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছেন বারবার। অথচ আজ আমাদের কাছে পরিস্কার একটি চিত্র দাঁড়িয়েছে যে আসলেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধে ঠিক কত সংখ্যক মানুষকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী নির্মম এবং অন্যায় ও পরিকল্পনামাফিক হত্যা করেছিল। সম্প্রতি খুলনা গণহত্যা যাদুঘর ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের গণহত্যা জরিফ জেলাওয়ারি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩২ জেলার তথ্য আমরা জানতে পেরেছি। তাতেই যে চিত্র আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়েছে তাই যেন এক ভয়ানক চিত্র। বহুল পঠিত ও কথিত ত্রিশ লক্ষ শহিদের কথা যে বলা হয় সে সংখ্যাকে ছাড়িয়ে তা চল্লিশ লক্ষ অতিক্রম করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট এর মাধ্যমে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালি হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দমন ও স্বাধীনতাকামীদের নিশ্চিহ্ন করার হীন উদ্দেশ্যে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তারা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল। এটা পরিস্কার যে বাঙালি নারীদের ধর্ষণ নিছক কোন যৌন তাড়না থেকে ছিল না বরং বাঙালি জাতিসত্ত্বার স্বকীয়তা শেষ করে দিয়ে পাকিস্তানি সন্তান জন্ম দেওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য যেন বাঙালিরা পরে একটা জাতীয়তার সংকটে পড়ে। কী নির্মম, কী নৃশংস্য হত্যাকান্ড সেসময়ে তারা ঘটিয়েছে এখন ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পাকিস্তানি হায়েনারা এদেশের ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করে। অথচ আজও আমরা বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের এ জঘন্য গণহত্যার স্বীকৃতি পাইনি। জাতিসংঘ ঘোষিত গণহত্যার ৫টি বৈশিষ্ট্যর মধ্যে ৪টি বৈশিষ্ট্যই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে নৃশংস্য গণহত্যায় সংঘঠিত হয়েছে বলে গবেষকগণ নিশ্চিত হয়েছেন, বিধায় এ গণহত্যার বিচার দাবী যৌক্তিক এবং এ হিত্যাকান্ডের বিচারে আমাদেরকে আরো সক্রিয় বূমিকা নিতে হবে বলে জোর দাবী উঠেছে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে বিশ শতকের সবচেয়ে ভয়ংকর ৫টি হত্যাযজ্ঞের মধ্যে একটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এখনো এ নির্মম গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলেনি, এর পিছনে রয়েছে বিশ্বমোড়েলদের রাজনীতি। যেহেতু যখন কোন জেনোসাইট বা গণহত্যার স্বীকৃতি জাতিসংঘ দেয় তখন সেটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ফলে জেনেসাইট বন্ধ করা এবং দায়ীদের শাস্তি বিধান করা জাতিসংঘের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। তখন এর দায় বিশ্বমোড়েলদের কাঁধেও এর দায় এসে পড়ে। স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে জাতিসংঘ বাংলাদেশের গণহত্যার ক্ষেত্রে এখনো জেনোসাইট শব্দটি ব্যবহার না করে কৌশলে ম্যাসাকার শব্দটি ব্যবহার করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করেছে এবং বেশকিছু মামলার রায় ঘোষণা ও বাস্তবায়নও হয়েছে। ভবিষ্যতে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিচার এবং ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব হবে। তবে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিলে বিশ্বের দৃই পরাক্রমশালী রাষ্ট্র চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭১ সালের নেতিবাচক ভূমিকা তখন অফিসিয়ালি স্বীকৃতি পাবে। এ কারণে স্বীকৃতির বিষয়টি বেশ জটিল বটে বিষেশজ্ঞগণ বলে থাকেন। বাধা থাকবেই এটি আজ ১৭ কোটি বাঙালির প্রাণের দাবী, তাই স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আমরা ইতিহাসের জঘন্য এবং নৃশংস হত্যাকান্ডের আন্তর্জাতিক বিচার চাই।
পড়ুন প্রবন্ধ : রুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি

এটা তো স্পষ্ট যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরিকল্পিত নীলনকশা ছিল বাংলার সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। এই পরিকল্পনার মধ্যে সাধারণ দিনমজুর থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ স্থানের মানুষ। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা তাদের এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনায় কেবল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নয় তাদের সহযোগি রাজাকার, আলবদর এবং আলশামস বাহিনীও ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। মূলতপক্ষ বাংলাদেশের সর্বত্র গণহত্যা ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যার অন্যতম প্রমাণ একাত্তরের শেষের দিকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড। আর নয় মাসব্যাপি সারাদেশে যে ব্যাপক গণহত্যা ও নির্যাতনের উৎসব করে এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তার নজীর পৃথিবীতে খুবই বিরল। আমরা গকেষণায় দেখেছি প্রত্যন্ত গ্রাম যেমন দাদুল কিংবা আটপুকুর হাটও বা খুনিয়াদীঘিও হত্যাকান্ড থেকে বাদ যায়নি। শুধু তাই না তারা দাদুল গ্রামকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এবং বাড়িঘর গুড়িয়ে দিয়ে একদম নিশ্চিন্ন করার চেষ্টা করে। এ নিয়ে আমার আটপুকুরহাট গণহত্যা গ্রন্থে আমি বিস্তারিতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। আলোচ্য গ্রন্থে সেই ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ নির্মোহ দৃষ্টিতে তুলে ধরার সতত চেষ্টা করা হয়েছে, যা হয়তো মুক্তিযুদ্ধের পরিপূর্ণ ইতিহাস নির্মাণে সহায়ক হবে বলে আশা করছি।
এবার গণহত্যার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে আসা যাক-
গণহত্যা শব্দটির ইংরেজি করতে সাধারণত জেনোসাইট (Genocide), ম্যাস কিলিং (Mass killing), ম্যাস মার্ডার (Mass murder), ম্যাসাকার (Massacre) শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। কিন্তু শব্দগুলোর মধ্যে সুক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করাকে ম্যাস কিলিং, ম্যাস মার্ডার বা ম্যাসাকার বলে। আর বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইট বা গণহত্যা বলা হয়। জেনেসাইট (Genocide) শব্দটি গ্রীক শব্দ Genose ও ল্যাটিন cider শব্দ থেকে এসেছে। Genose শব্দের অর্থ জাতি বা মানুষ আর cider শব্দের অর্থ হত্যাকা-। জেনেসাইট শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন পোলিশ আইনজ্ঞ রাফায়েল লেমকিন। এফবিআই এর মতে, গণহত্যা হলো সেই হত্যাকা- যখন কোন ঘটনায় চার বা তার অধিক সংখ্যক মানুষ মারা যায় এবং হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোন বিরতি থাকে না। পৃথিবীতে বেশ কিছু গণহত্যার উদাহরণ আছে। তারমধ্যে জার্মানিতে ইহুদি গণহত্যা, আর্মেনীয় গণহত্যা, গ্রীক গণহত্যা, এশিরিয়ান গণহত্যা, ইউক্রেনীয় গণহত্যা, কম্বোডিয়া গণহত্যা, গুয়েতেমালা গণহত্যা, বসনীয় গণহত্যা ও বাংলাদেশ গণহত্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের The Convention on the Prevention and Punishment of the Crimes of Genocide বা জেনোসাইট কনভেনশনে গণহত্যার সংজ্ঞায়ন করা হয়, যেটি ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রেজ্যুলেশন ২৬০(৩) এর অধীনে গৃহীত হয়। এ রেজ্যুলেশনে গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় যা বিশ্বময় প্রতিরোধে সকল রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। রেজ্যুলেশন ২৬০ (৩) এর ২ নং অনুচ্ছেদে গণহত্যার ৫ টি বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হয়-
- পরিকল্পিত একটি জাতি বা গোষ্ঠিকে নির্মুল করার জন্য তাদের সদস্যদের হত্যা বা নিশ্চিহ্নকরণ।
- তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি সাধন।
- পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি বা গোষ্ঠিকে ধ্বংসকল্পে এমন জীবননাশী অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে তারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিন্ন হয়ে যায়।
- গোষ্ঠি বা জাতির মধ্যে জন্মরোধ করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া।
- একটি জাতি বা গোষ্ঠির মিশুদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্ম পরিচয় ও জাতিগত পরিচয়কে মুছে ফেলা।
উপরে উল্লেখিত ৫টি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যে কোন একটি বৈশিষ্ট্য থাকলেই সেটিকে গণহত্যা বলে বিবেচিত হবে। এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। ১৯৬৯ সালে জাতিসংঘ ভিয়েনা কনভেনশনে গণহত্যাকে জুস কজেনস (Jus Cogense) বা সর্বমান্য ও ক্ষমার অযোগ্য হিসেবে গণ্য করেছে। সে হিসেবে বাংলাদেশের গণহত্যা নিশ্চিতভাবেই গণহত্যা এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২৫ মার্চ রাতে হত্যাকান্ডের তীব্রতা সম্পর্কে মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন লিখেছেন, “সেই রাতে ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার হলো আরো ৩০০০ লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চললো মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হল যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হল। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।”
শুধু তাই নয় এই গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে যা এখন আমরা জানতে পারছি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয় যে: “১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি বাহিনীর হাতে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর ৯ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের জেনোসাইড কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সাধারণ পরিষদের ২৬০ নম্বর রেজুলেশনে অনুমোদন দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বহু বছর পর ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্ব সংস্থার এ পদক্ষেপ ছিল গণহত্যার ভয়ংকর পুনরাবৃত্তি রোধ করা। এর পরও থামানো যায়নি গণহত্যার মতো নির্বিচার এবং বিশেষ জনগোষ্ঠীকে নিধন করার পরিকল্পিত প্রয়াস। সর্বশেষ ইউক্রেনেও গণহত্যা ঘটছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ।
আশার কথা জাতিসংঘ এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রাচীন ও সাম্প্রতিক গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি পাওয়া গণহত্যার মধ্যে অটোমান টার্কদের হাতে ১৯১৫ সালে ১৫ লাখ আর্মেনীয় হত্যা; ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় ৮ লাখ তুতসি জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজিদের হাতে ইউরোপে ৬০ লাখ ইহুদি হত্যা, ১৯৯২ সালের বসনিয়া ও ১৯৭৫ সালের কম্বোডিয়ার গণহত্যা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ৩০ লাখ বাঙালির পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ঘটে, তার কোনো স্বীকৃতি আজও দিতে পারেনি বিশ্ব সংস্থা! যা কেবল দুঃখজনক নয়; বিশ্ব সংস্থার চরম ব্যর্থতা ও দৈন্যেরই বহিঃপ্রকাশ বললে নিশ্চয়ই অতুক্তি হয়না। শুধু তাই নয়; এমন ব্যর্থতার যুক্তিসংগত কারণও দেয়নি জাতিসংঘ আজও দেয়নি। অথচ বিশ্ববাসী স্পষ্ট জানে, ১৯৭১ সালে মাত্র ৯ মাসে পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসর বাংলাদেশের মাটিতে যে গণহত্যা চলায় তা ছিল ২০ শতকের নৃশংস গণহত্যাগুলোর অন্যতম।
ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, যে পরিকল্পিত বর্বরতায় ৩০ লাখ যা সংখ্যাটি আরো বেশি সম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং যার বিস্তারিত বিবরণ বা তথ্য গোটা বিশ্বেই আছে। নির্মম বর্বরতায় নির্বিচারে ধর্ষণ, মানুষকে পুড়িয়ে মারা , নদী-খাল-বিলে ভেসে থেকেছে গলিত লাশ, যার শত শত ছবি বিশ্ববাসী দেখেছে, এই গণহত্যার জোরালো স্বীকৃতি আছে বিশ্বজোড়া সংবাদপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও হাজারো প্রামাণ্যচিত্রে। দেশ-বিদেশে শত শত বই লেখা হয়েছে বিংশ শতাব্দীর এই নৃশংসতম গণহত্যা নিয়ে। হয়েছে গবেষণা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
সেই বর্বরতার স্বীকৃতি জাতিসংঘ থেকে ৫১ বছরেও মেলেনি বড়ই আপসোসের বিষয়। যদিও বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। হয়তো একদিন এ হত্যাকান্ডকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেবে। তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট ৩ জুন ১৯৭১ সালে এক বিবৃতিতে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে বলেন:`The Happenings in East Pakistan Institute on the Most Tragic Episodes in Human History. Of course, it is for future historians to gather facts and make their own evaluation, but it has become a very terrible blot on a page of human history.’
এবার আসা যাক দিনাজপুর জেলায় সংঘঠিত গণহত্যার সংখ্যা প্রসঙ্গে-
সম্প্রতি বাংলাদেশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং ১৯৭১;গণহত্যা–নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাষ্ট এর তত্বাবধানে দিনাজপুর জেলা গণহত্যা–বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ সম্পন্ন হয়েছে যা আবার গ্রন্থিত আকারে প্রকাশ্ও হয়েছে। কবি ও গবেষক মোজাম্মেল বিশ্বাস একান্ত প্রাণের তাগিদে মুক্তিযুদ্ধের হারানো ইতিহাস অত্যন্ত নিবিড়ভাবে গবেষণা করে দিনাজপুর জেলার একটি পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যদিও অনেক তথ্য বাদ পড়েছে তথাপিও বলা যায় মুক্তিযুদ্ধের দিনাজপুর ইতিহাসে এ গ্রন্থটি একটি অসাধারণ সংযোজন। আমার সৌভাগ্য যে এ গবেষণা কর্মে আমিও তাঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছি।
গবেষণার আগে প্রচলিত মতে ধারণা ছিল দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় ৫৫–৫৬টির মতো বধ্যভূমি ও গণকবর আছে। কিন্তু এ গবেষণায় এ সংখ্যাটি ১৮৬৭। এ হিসেবে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে শুধু দিনাজপুর জেলাতেই বলে গবেষণায় প্রতীয়মান। গণহত্যার কি ব্যাপকতা এবং তীব্রতা তা সহজেই অনুমেয়। ত্রিশ লক্ষ শহিদ বলে যে সংখ্যাটি প্রচলিত, সে সংখ্যাটি চলমান গবেষণা শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তাই এখন দেখার বিষয়।
আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষও। আশার খবর এই উদযাপনকালেই গণহত্যা গবেষণা বিষয়ক অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন’ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এ বিবৃতি প্রদানের প্রেক্ষিতে বলা যায়, এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠান জোরালোভাবে বাঙালি গণহত্যার বিচার দাবি করেছে এবং জাতিসংঘকে এই গণহত্যার স্বীকৃতি দিতে দাবি জানিয়েছে। লেমকিন ইনস্টিটিউটের বিবৃতির শেষাংশটি এ রকম: Given the Lack of Board International Recognition the Lemkin Institute calls on the international community, including the United Nations, to urgently recognize the Bengali genocide as a way to pay tribute to The Victim and Two Hold Perpetrators are accountable.
অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে আরও একটি বিবৃতি পাওয়া গেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘জেনোসাইড ওয়াচ’-এর পক্ষ থেকে। বিশ্বব্যাপী গণহত্যা নিবারণের উদ্দেশ্যে গঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি সুস্পষ্ট ভাষায় লিখেছে: ‘This Crimes by the Pakistani Military Forces constituted the Crime Against Humanity of Murder, Extermination, Deportation of Forcible Transfer of Population, Imprisonment of Other Severe Deprivation of Physical Liberty, Torture, Rape, Sexual Violence, Persecution, Enforced Disappearance of Persons and Other Human Acts.
তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা জোর দাবী জানাই, বাংলাদেশ যে গণহত্যার শিকার, গণহত্যা দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস যেখানে আমাদের প্রাণের দিবস, যেখানে জাতি তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করে, যে দেশে হাজার হাজার গণকবর ও বধ্যভূমি আজও ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; সেই বাংলাদেশ গণহত্যার স্বীকৃতি নিতে বিশ্ব সংস্থার ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করেছে- সেবিষয়টিও আজ অন্যতম আলোচনার বিষয় হবে না নিশ্চয়ই। আজ জাতি হিসেবে আমাদের অবশ্যই পর্যালোচনা করতে হবে- বিশ্ব সংস্থার থেকে বাঙালি গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে আমরা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছি। যদিও অনেকে বলবেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে; এ নিয়ে বলে কী আর হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে গণহত্যার মতো বিষয় কখনও তামাদি হয় না, হলে নিশ্চয়ই ১৯১৫-২৩ সালের আর্মেনীয় গণহত্যার স্বীকৃতি মিলত না।
তাই আজ আমদের শপথ হোক বাঙালি গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য এখনই একটি রোডম্যাপ তৈরি করা। আর লক্ষ্যে পৌঁছার পরিকল্পনাসূচি তৈরি করে সেভাবে কাজ করা। সরকারকে গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হোক সুবর্ণজয়ন্তীর অন্যতম অঙ্গীকার । প্রয়োজনীয় তথ্য, সাক্ষ্য ও যুক্তি সংবলিত আবেদন এর জন্য বিশেষজ্ঞ কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করা। আর কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার উদ্যোগ গ্রহন করা। যেসব দেশ ও সংস্থা পাকিস্তানি গণহত্যার সমালোচক এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিল, তাদের সমর্থন আদায় করা। দেশের শিক্ষাক্রমে গণহত্যা যুক্ত করা। সকল গণহত্যার স্থানসমূহকে এবং গণহত্যার নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা। প্রতি জেলায় জেনোসাইড আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করে সকল তথ্য সংরক্ষণ করা। চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা। এক্ষত্রে ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সময় পাকিস্তান সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার সংক্রান্ত যেসব বিবৃতি দিয়েছে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশকে আর আত্মরক্ষামূলক নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্থ রাষ্ট্র হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। পাকিস্তানকে মনে করিয়ে দেওয়া যে ১৯৭১ সালে তারা বাংলাদেশের মাটিতে যে বর্বরতা ঘটিয়েছে, তা বাঙালি জনগোষ্ঠী ভোলেনি; ভুলবে না কখনও। এক্সত্রে প্রবাসী বাঙালি ও মানবতাবাদী বিশ্ব জনগোষ্ঠীকে এ আন্দোলনে যুক্ত করার মাধ্যমে এ আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে। এক্ষেত্রে ১৯৭২ সালে ‘দি ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্ট’-আইসিজ প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। এতে স্পষ্টাক্ষরে লেখা আছে- কীভাবে এ গণহত্যা ঘটানো হয়েছে। নারী-শিশু নির্বিশেষে কীভাবে নির্বিচার গুলিবর্ষণ, বোমা ও আগুন দিয়ে মুসলমান-হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে; নারীরা নির্বিচারে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আমরা জানি সব দেশেই যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের স্বীকৃতি ও বিচারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবতার লড়াই, মানব সভ্যতার লড়াই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে আরো যুক্ত আছে জাতীয় ইতিহাসের লড়াই। অতএব, বাঙালি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি নিছক কোনো দবি নয়। এটি বাংলাদেশের অধিকার। ৬৪ জেলায় চলমান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং ১৯৭১; গণহত্যা–নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাষ্ট এর তত্বাবধানে জেলা গণহত্যা–বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ সম্মন্ন হলেই আমরা খুব শীঘ্রই গণহত্যার প্রকৃত চিত্র ও সংখ্যা আমরা জানতে পারবো বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি। তখন গণহত্যার স্বীকৃতি, বিচার এবং শহিদের সংখ্যা নিয়ে সব বিতর্কের অবসান ঘটবে।
তথ্যসূত্র:
1. www.genocidemuseumbd.org/background
2. www.bn.wikipedia/wiki/ MYnZ¨v
3. www.bn.wikipedia/wiki/ MYnZ¨v
4. www.genocidemuseumbd.org/background
5. www.banglanews24.com, 25 gvP© 2018
6. মোজাম্মেল বিশ্বাস, দিনাজপুর জেলা গণহত্যা–বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ
7. চাষা হাবিব, ১৯৭১: ফুলবাড়ি দিনাজপুর
চাষা হাবিব
কবি ও গবেষক

