Sunday, March 1, 2026
spot_img
Homeগবেষণারুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি

রুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি

চাষা হাবিব
রুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি

রুচির দুর্ভিক্ষ কিংবা রুচির সংকট যে বর্তমানে প্রবল আকার ধারণ করেছে তার উপর আলোপাতের পূর্বে এর পটভূমিটাও জানা দরকার বলে মনে করি। সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই মানুষ তার চারপাশ সাজিয়েছে কিংবা চারপাশের প্রয়োজনীয় উপাদান সাপেক্ষেই গড়ে তুলেছে তার মনন–কৃষ্টি এবং জীবনবোধের। আর এই পদযাত্রায় মানুষ আপন সত্ত্বায় স্বমহিমায় এগিয়েছে সদা প্রবাহমান প্রগতির পথে। যে পথে কখনো বন্ধুর কখনো সমতল আবার কখনো বা পঙ্কিল উষর। যেখানে মানুষ নামক এই জীবটি নিজেই নিজের অবয়ব তৈরি করে নিজেকেই বানিয়েছে ঈশ্বর–ভগবান–আল্লাহ বা স্রষ্টা। ফলত কার্যকরি সংগঠন নির্মাণে মানুষ যেমন রুচিকর পরিবেশ তৈরি করেছে তেমনি আবার অরুচিকর পরিবেশেরও জন্ম দিয়েছে কিংবা কখনো ইচ্ছা করেই তা করেছে। কালের খেয়ায় এই ভাঙ্গা গড়ায় মানুষ সময়ের বুনটে নিজেদের আবদ্ধ করেছে রাজনৈতিক কাঠামোর দাবার ঘুটিতে। ক্ষমতা বলয়ের ইচ্ছার উপরই আবর্তিত হয়ে প্রান্তিক ও আপামর জনতার রুচিবোধ শিষ্ঠাচার–কৃষ্টি ও সমাজের আচার–আচরণ যাকে আমরা সংস্কৃতি বলছি। আবার সভ্যতাও বলছি। তাহলে দেখা যায় যে, ক্ষমতা কাঠামোর প্রত্যক্ষ মদদে কিংবা প্রচ্ছন্ন ছায়ায় সেই ভূখন্ড বা এলাকার জনমানসের নৃতাত্ত্বিক কাঠামো নির্মিত হয় বা হয়ে থাকে আবার হয়েছেও। আর এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ স্বভাবতই ক্ষমতা বলয়ের কেন্দ্রিয় যোগসূত্রের আরোপিত জীবন ব্যবস্থায় নিজেকে পরিচালিত করেছে কখনো জাতীয়তাবাদী প্রবল সক্রিয় তত্ত্বে, কখনো বা রাষ্ট্রবাদী তত্ত্বে, কখনো বা ধর্মীয় মূল্যবোধের রাষ্ট্র ক্ষমতার অদৃশ্যবাদী ক্ষমতার উপর থেকে আরোপিত এবং নির্ধারিত (up-bottom) কাঠামোয়। ফলে আম–জনতার স্বাপ্নিক দ্রষ্টা মূলত ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আগত, আর এখান থেকেই কৃষ্টি–কালচার–ভাষা–শিক্ষা–সংস্কৃতি–মূল্যবোধ প্রভৃতি সবেরই মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে রুচি বা রুচিশীল মননের। তাই বলা যায় রুচি আপনা আপনী গড়ে ওঠে না, এর পিছনে অনেকগুলো নিয়ামক কাজ করে। তবে মূল নিয়ামক হিসেবে কর্তৃত্ব ফলায় অবশ্যই ক্ষমতা কেন্দ্রের চাহিত–চর্চিত–জীনাদর্শন বা ভাবাদর্শের উপর একথা জোর দিয়েই বলা যায়।

এবার আসা যাক রুচির গড়ন ও গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে–
প্রথমেই দেখা যাক রুচি শব্দটির উৎপত্তিগত অর্থ সম্পর্কে। ‘রুচি’ শব্দটি একটি তৎসম শব্দ। যা আার্যগত ভাষাশৈলীর মানভাষিক বা প্রমিতকরণের ফলে উদ্ভূত। বলা হয় রুচি হলো work of art এর ফল বা ফলাফল হিসেবে তৈরি হয়। আমরা যদি লক্ষ্য করি রুচির চর্চা পরিবার থেকেই শুরু হয়। পরিবার শিশুর সামাজিকীকরণের আতুর ঘর। ফলে শিশুর যে sense of tasting বা রুচি গড়ে ওঠে তা তার পরিবারের sense of tasting । সমাজের মৌলিক একক পরিবার, ফলে পরিবারের জন্য যেসব চলক বা নিয়ামক বা উপাদান ক্রিয়াশীল তার সবকটিই শিশুর মনন তৈরি করে। এই মননের সামাজিক রূপই হলো রুচি। যদি পরিবারে শিষ্ঠাচারের চর্চা হয় তাহলে শিশুও শিষ্ঠ হয়। যদি মা তার গৃহ বা বাড়ি বা থাকার জায়গা ঘরকে গুছিয়ে পরিপাটি করে তোলেন, তবে সেই পরিবারের শিশুর মনে আপনা আপনি থেকেই সৌন্দর্যবোধ এবং পরিপাটির আভিজাত্যবোধের সৃষ্টি করে ফলে সেই পরিবারের শিশুর মধ্যে মার্জিত মননের রুচিকর বিকাশমান বোধের অহম প্রাপ্ত হয়। তাই তো আমরা দেখি পরিবারের কর্তা তথা বাবা–মা’র পেশার উপরও শিশুর রুচি তৈরিতে এইসব চলক ক্রিয়াশীল থেকে শিশুকে মানবিক ও মনন–সৃজন ও রুচিশীল করে গড়ে তুলতে থাকে। শিশুরা তার বাবা–মা, দাদা–দাদি, ভাই–বোন, চাচা–চাচি সহ তার সামনে পরিবারের এবং কখনো কখনো সমাজের যাকে দেখে তাকেই অনুসরণ ও অনুকরণ করে। এক্ষেত্রে মা–বাবা, ভাই–বোন, দাদা–দাদি অর্থাৎ একান্ত নাড়ীর আত্মীয়তার বন্ধন অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। আবার শিক্ষাকেন্দ্রে চর্চিত বিষয়াবলীও শিশুর রুচিবোধর সৃষ্টি করে, ফলে বিদ্যালয় বা শিক্ষাকেন্দ্র রুচি তৈরির অন্যতম ক্ষেত্র বলে বিবেচিত।

এছাড়া পরিবারের ভাষা, পোষাক–পরিচ্ছেদ, খাদ্যাভাস, ধর্মীয় পরিবেশ, মুল্যবোধ, পেশাগত সংস্থান, আয়ের উৎস, আয়ন–ব্যয়ন, জীবিকায়ন এবং যাপিত জীবনরীতি প্রভৃতি পরিবারের সদস্যদের সামজিকীকরণে উদ্বুদ্ধ করতে এইসব উপাদান সর্বদা ক্রিয়াশীল থেকে পরিবারের সদস্যদের মনন গড়ন এবং সামাজিক রুচিবোধের জন্ম দেয়। যা ঐ পরিবারের সদস্যরা পারতপক্ষে আজীবন ধারণ, লালন–পালন এবং মেনে চলে, সমাজে তার রুচির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আবার অনেক সময় পরিবেশ পরিস্থিতি এবং কর্মজীবনও রুচি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। দেখা যায় প্রত্যন্ত পরিবেশ কিংবা অরুচিকর–অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থেকে আগত ব্যক্তিও পরিবেশের প্রভাবে তার রুচি ও মননের পরিবর্তন ঘটিয়ে মানানসই এবং যুতসইভাবে অভিযোজিতের মাধ্যমে নিজের রুচিকে পরিশীলিত করে তোলে। তাই বলা যায় পরিবেশ–পরিস্থিতি (এবং এখানেই গড়ে ওঠে আর্থিক সক্ষমতা যা সঙ্গতিকে বৃদ্ধি করে) রুচি তৈরিতে অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এ দুটি চলক মনুষ্য রুচির প্রধানতম মানদন্ড নির্ণয় করে, ফলে রুচি একটি অভিযোজনিক প্রক্রিয়া হিসেবে সতত ক্রিয়াশীল থাকে।

তবে মজার ব্যাপার হলো এ দুটি উপাদান বা চলকই রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে রুচির গড়ন এবং গঠন প্রশ্নে রাজনীতির ঘাড়েই গিয়েই এর দায় পড়ে। তাই বলা যায়, একটা ভূখন্ডে বা দেশের বা সমাজের বেশিরভাগ মানুষের রুচি গড়ে ওঠে সেই সমাজের বা দেশের বা ভূখন্ডের ক্ষমতা কাঠামোয় কি বা কীসের চর্চা–পরিচর্চা হয় এবং মননের কাঠামো তৈরিতে সেই সমাজ, রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকেন্দ্র সচেষ্ট, তার উপর। তাহলে রুচির নির্মাণ প্রশ্নে আমরা নিন্মোক্ত চলক বা নিয়ামকসমূহ কে চিহ্নিত করতে পারি–

  • ক্ষমতা কাঠামোর আদর্শ ও পরিচলন প্রক্রিয়া
  • সমাজ প্রচলিত কাঠামো
  • জাতীয়তাবাদী চর্চা
  • আদর্শবাদীচর্চা (বিভিন্ন ঈজম)
  • ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষমতা কাঠামো
  • আয়ন–ব্যয়ন বা আর্থিক সক্ষমতা
  • পেশা বা পরিবেশ–পরিস্থিতি
  • সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক সমাজ চেতনা
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য চর্চা
  • শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতি এবং কৃষ্টি
  • জীবন বোধ ও রাজনৈতিক চর্চা
  • ধর্মীয় জীবন (পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়)

রুচির গঠন প্রক্রিয়া
রুচির গঠন প্রক্রিয়াটি আমরা নিম্নোক্ত গ্রাফচিত্রের সাহায্যে দেখাতে পারি। যেখানে রুচিশীলতা বর্ণিত চলকসমূহের একটি পারস্পারিক মিথোস্ক্রিয়া বা উভমুখী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। আর এর মূল নিয়ামক হলো ক্ষমতা কাঠামো।

রুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি
রুচির গঠন প্রক্রিয়া

একথা মনে রাখতে হবে যে, রুচিশীলতা তৈরিতে অন্যতম ভূমিকা রাখে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ যেমন– সাহিত্য, শিল্পকলা, সংগীত, নাটক–সিনেমা এবং সামাজিক আচার–আচরণ, প্রথা, কৃষ্টি, লোকাচার, বিশ্বাস এবং ট্যাবু। আমরা একটা কথা প্রায়শই ভুলে যাই যে শুধু সাংস্কৃতিক উপাদনই রুচি বা মননের সৃষ্টি বা জন্ম দেয় না। এর সাথে পারিবারের চিরায়ত চর্চারও ভূমিকা অনন্য। এক্ষেত্রে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার পরিবার বৃহৎ সমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ তাই এটি একটি উভমুখী ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়া, যেখানে উভয় চলক পরস্পরের পরিপূরক ও অনুঘটক।

একটা সমাজে কী করণীয়, কী বর্জনীয়, কী তার ন্যায়–নীতি, কী তার কাস্টম বা প্রচলিত ঐতিহ্য–প্রথা কিংবা কোনটা মার্জিন বা সীমা তারই কাঠামোগত বহিঃপ্রকাশ রুচি। এক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার, পোষাক–পরিচ্ছেদ এবং শিষ্ঠাচার তথা আচরণগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি মিলেই রুচির শরীর দাঁড়ায়। নিজেকে সৌন্দর্যের অংশ মনে করা এবং সেই সৌন্দর্যকে সার্বজনীন রূপদান করাই রুচিশীলতা। আমার কাছে যা রুচিকর বা রুচিশীল বলে মনে হলেও তা অন্যের কাছে কিংবা অন্য ভূখন্ডের মানুষের কাছে তা রুচিকর বা রুচিশীল হিসেবে গ্রহণীয় নাও হতে পারে। তাই সর্বজনীন সৌন্দর্য এবং গ্রহণীয় বিষয়কেই রুচিশীল বা রুচিশীলতা বলা যায়। মোট কথা মার্জিত, শিষ্ট এবং সর্বজন গ্রহণীয় আচার–আচরণিক ভঙ্গিমা ও অভিব্যক্তিক বহিঃপ্রকাশ–ই রুচিশীল বলে খ্যাত। কেউ কেউ আবার পরিচ্ছন্ন, সৌন্দর্যশীল এবং কাঠামোগত অবয়বই রুচিশীল বলে মনে করেন। রুচির প্রশ্নে পরিবেশ–পরিস্থিতিই আসল কথা বলে মনে করা হয়। একজন বিত্তশালীর কাছে যা রুচিশীল, একজন গরীব কিংবা নিন্ম শ্রেণির অসহায়ের কাছে তা রুচিশীল মনে হতে নাও পারে। এখানে শ্রেণি–সময় ও অবস্থাভেদে রুচিরও তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। তাই বলা যায় রুচিশীলতা গড়ে ওঠে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক জীবন–যাপন এবং জাতীয় বিষয়াবলীর চর্চিত রূপায়নের মাধ্যমে, যেখানে রাষ্ট্র আরোপিত জাতীয়তাবাদী ভূমিকা এ ক্রিয়ায় মুল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে।

এবার আসা যাক রুচির সংকট প্রসঙ্গে–
সংকট শব্দটি মূলত নেতিবাচকতা অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সাধারণত যোগানের ঘাটতি থেকেই সংকটের জন্ম। বলা যায়, কাক্সিক্ষত আচরণিক বৈশিষ্টের কমতি সেই রুচির সংকটকে দৃশ্যমান করে। রুচির সংকট মূলত তৈরি হয় শ্রেণি বৈষম্য এবং শোষণ–শাসনের অসাম্য অবস্থা থেকে। একটা সমাজ বা দেশে যত বেশি বৈষম্য সেখানে তত বেশি রুচির তারতম্য। যত বেশি অর্থ আয় বৈষম্য তত বেশি রুচির বৈষম্য দেখা দেয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র কাঠামোর দূর্বলতা, শাসনের বৈকল্য, রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার, নীতি নৈতিকতার অবক্ষয়, দালাল–লেহন–তোষণ রাজনৈতিক চর্চা ও দূর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি ও ঠগী রাজন্যতন্ত্র এবং শিক্ষার অপরিনামদর্শীতা সহ সংস্কৃতির মনোবৈকল্য সমাজে রুচির সংকট প্রকট করে তোলে। এখানেই রাজনৈতিক অপরিনামদর্শীতা ও অপরাজনৈতিক চর্চা সমাজে মনোবৈকল্যের সুবাধে প্রচলিত সংস্কৃতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যার ফল হিসেবে সমাজে অন্যায়, অনাচার, ঘুষ এবং প্রচলিত আইনের প্রতি অনস্থা তৈরি করে সমাজে ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তির অশুভ মহড়ার জন্ম দেয়, যা শেষপর্যন্ত রুচির প্রশ্নে অপরুচির সংস্কৃতির সৃষ্টি করে।

ক্ষমতা কাঠামোর উপরিকাঠামো নিজেদেরকে সমাজের ধর্তাকর্তা মনে করে নিচের কাঠামোকে অপাংক্তেয়–শ্লেষ এবং অমার্জিত বলে ধরে নিয়ে নিজেদেরকে রুচির প্রশ্নে উন্নত মনে করে, ফলত তারা নিজেদের মত করে আশরাফ–আতরাফ সংস্কৃতির জন্ম দেয়। আবার তারাই এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে এই সাংস্কৃতিক বিভাজনকে সমাজে টিকিয়ে রাখে, আর এর জন্য যা করার তাই করে। ফলে সমাজে মোটাদাগে সংস্কৃতি বলেন কিংবা রুচি বলেন এর দুটো শক্তিশালী ধারার জন্ম হয়। গ্রামের কিংবা তথাকথিত নিন্ম শ্রেণির সংস্কৃতি তাদের কাছে অস্পৃশ্য থেকেই যায় যেমনটা আমরা দেখছি অহোরহ। তাদের শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতি অনেকটা আরোপিত হয়ে ভাড়াটিয়া সংস্কৃতির মতো মেকি রুচির জন্ম দেয়, যা প্রান্তিক ও নিচের সারির জনতাকে ফেলে তলানীতে। ফলে, তারা আশরাফ বা তথাকথিত মান সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যায় কিংবা তাদেরকে দূরে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে সেই শূন্যস্থানে জন্ম নেয় চরম রুচির সংকট। সেখানে জন্ম নেয় মানহীন–অমার্জিত (তথাকথিত শিক্ষিত এবং উপরিকাঠামোর ভাষায়) মানুষের জীবন ও পেশা ঘনিষ্ট সংস্কৃতি ভাবনা ও অনেকটা অপাংক্তেয় উচুতলার মতে গেঁয়ো, অমার্জিত, খ্যাত কিংবা চাষা বাঙাল মফিজ মার্কা রুচির সংস্কৃতি। আবার আধুনিকতার নামে সেখানটায় বটতলা কালচার (নব্য আর্যকালচার বলা যায়) এর জন্ম দেয়। আর এই শূন্য¯থানে সেই সুযোগে জন্ম হয় চরম দেওলিয়া সংস্কৃতি, যা লোয়ার ক্লাস সেন্টিমেন্ট বা ব্রাত্যজনের সংস্কৃতি নামে অভিহিত করা যায়। সেখানেই তথাকথিত টিকটক, লাইকি, ফেসবুক কিংবা মোটাদাগে হিরো আলম সংস্কৃতির জন্ম হয়। অথচ এর দায় ক্ষমতা কাঠামোর এবং তথাকথিত উচুতলার আরোপিত শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির। এখানে শিক্ষা কাঠামো এবং শিক্ষাসংস্কৃতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। আবার উল্লেখিত দুই’য়ের মাঝে অবস্থিত শিক্ষিত ও মার্জিত এবং মোটামুটি মানসম্মত ও রুচিকর শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতি এবং কৃষ্টির চর্চায় থেকে সমাজের কিছুটা শিক্ষিত এবং নিজেদের জ্ঞানী ভাবা এই শ্রেণি মনে করে তারাই জাতিকে উদ্ধার করে এবং তারাই জাতির একমাত্র সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারী। তারা এই মতের অনুসারী হয়ে এমন এক সংকর রুচির জন্ম দিয়ে মারাত্মক রুচির সংকটে জাতিকে আচ্ছন্ন করেছে, ফলে নিম্ন কাঠামোর শ্রেণি চেতনার সংস্কৃতি হয়েছে জাতীয় চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন। এই দুই চেতনার মাঝের ফারাক যেন বাড়ছেই, তাই আমরা দেখি সর্বত্র দুটি ধারার চর্চা, যা সমাজকেও বিভক্ত করেছে। ফলে শিল্পী মমতাজ এর জনপ্রিয়তা তাই তো এই তথাকথিত নিম্ন শ্রেণির কাছে আকাশসম। অথচ এই মমতাজ আজোও শহুরে কিংবা সমাজের উপরিকাঠামোর কাছে কিছুটা লোক দেখানোর মতো করে পৌছুলেও মূলত তিনি শহুরে সমাজে অপাংক্তেয়ই রয়ে গেছেন। এইখানেই আমাদের মহাসংকট। ফলে তিনি তথাকথিত গেঁয়ো সংস্কৃতিতে মহারানী হয়ে উঠেছেন। এই ত্রি–মুখী ধারায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজেদেরকে রুচির একমাত্র উত্তরাধিকারী মনে করে এবং তারাই রুচিশীল জাতীয় মানস কাঠামো নির্ধারণ করে বলে ধরে নিয়েই প্রান্তিক–অমার্জিত গেঁয়ো চাষাদের সংস্কৃতিকে বাতিল বলে মনে করে এবং উচু শ্রেণির বিত্তশালীদের সংস্কৃতিকে ভাড়াটিয়া বা চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি বলে ধরে নিয়েই ত্রি–মুখী সংকটের সৃষ্টি করে, ফলে প্রান্তিক শ্রেণির সংস্কৃতি এই শূন্যতায় তথাকথিত সস্তা, নিম্নমানের রুচিহীন এবং অমার্জিত সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। আর এখানেই হিরো আলাম সহ টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউব প্রভৃতি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথাকথিত সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ এবং আজ সর্বত্র এ সংস্কৃতির জয়জয়কার। বলা যায় উপরি বিত্তশালীদের পার্টি কালচারের আড়ম্বরপূর্ণ বিকাশ। অথচ এর দায় কেউ নিতে চায় না। এজন্য দায়ী অবশ্যই প্রচলিত রাষ্ট্রকাঠামো এবং রাষ্ট্রের উণ্যাষিক আচরণ।
রুচির দুর্ভিক্ষে রাজনৈতিক দায়

হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি আমাাদের ইতিহাস ক্ষমতা দখলের ইতিাহস। বিগত ১০০০ বছরের ইতিহাসে আমরা দেখি বাঙালি সংস্কৃতি তার স্বকীয়তা হরিয়ে হয়ে উঠেছে মুলত বহুমুখী সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নিয়মনীতির আলোয় মিশ্র এক সংকর সংস্কৃতির। যেখানে মৌলিকত্ত্ব আর তেমন নেই বলেই ধরে নেওয়া হয়। আমরা এই দীর্ঘ এক হাজার বছরে না হয়েছি বাঙালি, না হয়েছি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা না হয়েছি মুসলিম, যেন অস্তিত্ব সংকটে আমরা হয়েছি অন্যকিছু। এখানেই আমরা রাজনৈতিক দাবার চালে হয়েছি বারবার এক নিদারুণ রেসের ঘোড়া। আমরা জানি পৃথিবীর হাজার রকম প্রাণীর মধ্যে একমাত্র মানুষেরই সংস্কৃতি আছে। সংস্কৃতি হলো জীবনধারা। অনেক প্রাণীরই জীবনধারা আছে যা অপরিবর্তনীয়–রূপান্তর বর্জিত। কিন্তু মানুষের সংস্কৃতি পরিবর্তনীয়, যা আবার নিরন্তন শেখার বিষয়ও। সংস্কৃতি হলো মানুষের অর্জিত আচরণ, পরিশ্রুত জীবনধারা। উৎকর্ষ অর্জনের বাসনা থেকে সংস্কৃতি গতিশীল হয়। বলা হয় সংস্কৃতি বহতা নদীর মতো প্রবহমান। তাই তো সংস্কৃতি দানা বাঁধে, রূপান্তরিত হয় সমাজ কাঠামোর চলমান ভিত্তিতে। সমাজ কাঠামোর অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে সংস্কৃতি রূপান্তরের দিকে পা বাড়ায়। আর এই অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে থাকে উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন কৌশল এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে রচিত ক্ষমতা কাঠামোয় আর্থ–সামাজিক অবস্থা, ধ্যান–ধারণা, দর্শন, জীবন সংগ্রামের সমগ্র কর্মকান্ড। হাজার বছর ধরে প্রচলিত গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর ভিত্তিতে চর্চিত স্বনির্ভর গ্রাম সমাজ বাঙালি সংস্কৃতির যে অবয়ব বা নকশা সৃষ্টি করেছে সেই চিত্র–চরিত্রকে আশ্রয় করে যন্ত্রনির্ভর আধুনিক নগর, আন্তঃনগর ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতি আজকের এক বৃহৎ জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। দিনকে দিন সে পথ আরও প্রসারিত–প্রশস্ত হচ্ছে। ১৭৫৭ পলাশীর নীলনকশা থেকে ১৯৭১ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমরা বহুধা ধারা উপধারায় সতত গতিশীল থেকে বাংলাদেশ নামক ভূ–খন্ডের সীমানায় বাঙালি সংস্কৃতির রাজনৈতিক কাঠামোয় একটি অনন্য রূপ দিতে পেরেছি। মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ছিল আজকের বাংলাদেশের সংস্কৃতিক পরিচয় তৈরির চূড়ান্ত সময়। এ সময়ই তৎকালিন পূর্ববাংলা হঠাৎই পূর্ব পাকিস্তান নাম ধারণ করে বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতির জন্ম দেয়। আর এর অভিঘাত হিসেবে বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে মহান মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে আমরা পেলাম আমাদের প্রিয় নিজস্ব ভূখন্ড বাংলাদেশ। একদল আধুনিক সমর–অস্ত্রধারী স্বৈরতন্ত্রী পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কর্তৃক লেলিয়ে দেওয়া দুর্ধর্ষ যোদ্ধা বাহিনীকে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে; গেরিলা কায়দায় পরাস্ত করে বাঙালি জাতিসত্ত্বা আপামর গ্রামীণ বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে পৌঁছে যায় অনন্য মর্যাদায়। একটি অনন্য সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবোধই ছিল এই সংগ্রামের মূল চেতনা, যা বঙ্গবন্ধু তাঁর জাদুকরী ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে প্রায় সমগ্র জাতিকে একই সংস্কৃতিক চেতনায় উজ্জ্বীবিত করেছিল বলেই মহান মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালি জাতির সংস্কৃতিক যুদ্ধও বলা হয়। তাই তো ১৯৭১–এর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন বাঙালির অমিয় গৌরব ও অহংকারের বস্তু, এখানেই বাঙালি–বাংলাদেশী সকল জনতাকে রুচির প্রশ্নে একই জাতীয়তাবোধের সুযোগ তৈরি করেছিল আমাদের মহান সংবিধান, যার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ক্ষত থেকে পূর্বেই সেকথা বলেছি। বিশেষত ’৪৭ এর দেশভাগে যারা পূর্ব পাকিস্তানে পুনর্বাসিত হলো, সেই অর্থে তাদের মধ্যে অভিবাসী বেশিরভাগই বাঙালি সংস্কৃতির ধারক–বাহক ছিল না। ফলে এর অভিঘাতের প্রথম আঘাত হলো বায়ান্নর ভাষা সংকট, যা বাঙালি সংস্কৃতিকে অরুচির প্রশ্নে প্রথম আক্রমন। কিন্তু বাংলাদেশের ৫০ বছরে আমরা বাঙালির সেই ঐক্যের সংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে পারিনি। যদিও আমাদের মহান সংবিধান সেই চর্চার জায়গাটি শুরু করে দিয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৫ এর পট–পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে অরুচির রাজনৈতিক চর্চা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় অরুচিকর সংস্কৃতির সামাজিক চর্চা, যার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল হলো আজকের এই সর্বত্র রুচির দুর্ভিক্ষ সেকথা বলা নিশ্চয়ই অতুক্তি হয় না। এটিকে আমরা রাজনৈতিক হাইব্রিড রিজিম এর মতো পরিকল্পিত সামাজিক–সাংস্কৃতিক–রাজনৈতিক অবক্ষয় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত সংস্কৃতির চেতনার পরিপন্থি বলতেই পারি।

এটা ধ্রুবসত্য যে, বাঙালি যেন তার স্বাধীন জাতিসত্ত্বার স্ফুরণ ঘটাতে না পারে, সেজন্য কালে কালে অনেক বড় বড় ষড়যন্ত্র হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কাল থেকেই, এমনকি স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালেও ষড়যন্ত্রের চক্রজাল নানা কূটকৌশলে ফেলা হয় বিভিন্ন দিক থেকে, কিন্তু অকুতোভয় বাঙালি যে সিধু, কানু, মহনলাল, মিরমদন, তিতুমীর, ক্ষুদিরাম–সূর্যসেনের বংশধর, তাঁরা জীবনপণ করে সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেছে স্বাধীনতার জন্য। বাঙালি সংস্কৃতির ভিত কতখানি শক্তিশালী শত্রুবাহিনীর কাছে তার প্রমাণ দিয়েই ১৯৭১ সালে এ জাতি স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়। আবার ২০২৪ জুলাই ছাত্র–জনতার অভুত অভ্যুত্থান আমাদের সেই কথাই যেন পুনরায় স্মরণ করে দেয় যে এদেশের মানুষ ক্রান্তিকালে ঠিকই একই কাতারে দাঁড়ালে কি অসাধ্যই না সম্পন্ন করতে পারে।

এটা মনে রাখা দরকার যে, সংস্কৃতি হলো চেতনা বা মানসিকতার ব্যাপার, আর এই চেতনা বস্তুভিত্তি থেকে জন্মায়। বস্তুর প্রভাবে সংস্কৃতি অস্তিত্বমান, জাগ্রত ও ক্রিয়াশীল হয়। মানুষের চিন্তা–ধ্যান–ধারণা, আচরণ ও কর্মের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে। সংস্কৃতি বাস্তব প্রয়োজনে জন্মে; দানা বাঁধে এবং জীবন সংগ্রামের শক্তি–সামর্থ্যের জোগান দেয়। জীবনযাত্রায়, জীবন চলার পথে ঘাত–প্রতিঘাতে সংস্কৃতির রূপ–রঙ্গ পরিবর্তিত হয়। গোপাল হালদার তার সংস্কৃতির রূপান্তর গ্রন্থে বলেন, ‘মানুষের জীবন–সংগ্রামের বা প্রকৃতির ওপর অধিকার বিস্তারের মোট প্রচেষ্টাই সংস্কৃতি’। অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি সমাজ কাঠামো তথা উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন পদ্ধতিকে নির্ভর করে গড়ে ওঠে। মার্কসীয় দৃষ্টিতে সংস্কৃতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সমাজ কাঠামো একটি কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। জীবন যেমন এক জায়গায় থেমে থাকে না, স্বাভাবিকভাবেই সমাজও এক স্তর থেকে অন্য স্তরে পা রাখে। ঘূর্ণায়মান যন্ত্রের মতো তার দৃশ্য পাল্টায়। দৃশ্য বলতে বোঝায় বিশ্বাস–ধর্ম–কর্ম–মূল্যবোধ, সর্বোপরি জীবন সংগ্রামের সবকিছুই। কালের বিবর্তনে উৎপাদন পদ্ধতিতে বিবর্তন ঘটে। আঠারো–উনিশ শতকে অথবা তারও আগে বাঙালি সংস্কৃতি কিংবা লোকসংস্কৃতির যে উপাদান ছিল, বিশ কিংবা একুশ শতকে তা নাই বা থাকা সম্ভব নয়। সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজ ক্রমশ বদলে যায়; এভাবে সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তনের পাশাপাশি উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে; এতে করে স্বাভাবিকভাবে সমাজ কাঠামো বদলে যায়; এর ফলে জীবনধারাও বদলে যায়। আর এভাবেই গড়ে ওঠে রুচিশীলতা, যা জাতির স্বাতন্ত্র্য প্রতিবিম্বিক চিহ্ন বলে মনে করা হয়।
রুচির প্রশ্নে বাঙালি সংস্কৃতি

আমরা জানি, সংস্কৃতি হলো সমাজের সমগ্র ব্যবহারিক প্রক্রিয়া, যা আবার সামাজিকভাবে হস্তান্তরিত হয় এবং যা বিভিন্ন প্রতীক দ্বারা চিহ্নিত। যেমন– ভাষা, সংগীত, নৃত্যকলা, বাদ্য, শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, আইন, দর্শন, রাষ্ট্র, সংঘ, নৈতিকতা, ধর্ম, সমগ্র যন্ত্রপাতি, ব্যবহারিক দ্রব্যাদি প্রভৃতি নির্মাণের বিদ্যা, ঐতিহ্য, রীতি–প্রথা, মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠান, উৎসব–অনুষ্ঠান এ সবই সংস্কৃতির আওতাভুক্ত। সংস্কৃতি যেহেতু বিবর্তন–পরিবর্তন মানে, তাই রূপান্তর তার মজ্জাগত। মার্কসের মতে সংস্কৃতি হলো সুপারস্ট্রাকচার বা অধিকাঠামো। এখানে উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদন সম্পর্ক নির্ধারণ করে সমাজের মূল চরিত্র। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ক সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলে; আর এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে গড়ে ওঠে সংস্কৃতি বা শিল্প, সাহিত্য, রাষ্ট্র–দর্শন–আইন–ধর্ম, যাবতীয় প্রতিষ্ঠান উৎসব–অনুষ্ঠান, সমাজের যাবতীয় চিন্তাচেতনা ও কর্মকা–। সমাজব্যবস্থা বা সমাজকাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিরও রূপান্তর বা পরিবর্তন ঘটে। যেমন আমরা দেখি আদিম সাম্যসমাজ, শিকারি ও যাযাবর সমাজ, কৃষি বা সামন্ত সমাজ, পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক সমাজ এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজের ক্ষেত্রে।

এটা সর্বজনবিদিত যে বাঙালি হিসেবে আমরা নৃতাত্ত্বিক ভাবে প্রধানত অস্ট্রিক ও মঙ্গোলয়েডদের বংশধর। আমাদের পূর্বপুরুষ অস্ট্রিক–মঙ্গোলয়েডদের সংস্কৃতিজাত বাঙালি, যা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। সাংখ্য, যোগ, তন্ত্র ও দেহতত্ত্ব তথা ইহবাদ হচ্ছে আদি মঙ্গোলয়েডদের দান, আর নারী দেবতা, বৃক্ষ দেবতা, জন্মান্তরবাদ অস্ট্রিকদের দান। এই অস্ট্রিক ও মঙ্গোলয়েডদের জীবনধারা বিশেষ করে সাংখ্য, যোগ, তন্ত্র ও নারী দেবতার প্রভাব বাংলাদশে আজও ক্রিয়াশীল। মানুষের সাধনা, মনুষ্যত্বের সাধনা তথা সাধারণ বাঙালির মধ্যে মনুষ্যত্ব সাধনার অনন্য উদাহরণ হলেন শীলভদ্র, অতীশ দীপঙ্কর, লালন, অক্ষয়কুমার দত্ত, বিদ্যাসাগর, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, আরজ আলী মাতব্বর প্রমুখ। আবার বঙ্গবন্ধুও অনন্য জ্বলন্ত উদাহরণ, তিনি সর্বদা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই সংগ্রাম করেছেন। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য প্রাণ্যোৎসর্গ করতেও সদা প্রস্তুত ছিলেন। বাংলার গণমানুষ ও বাংলার সংগ্রামী কৃষক যুগযুগ ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতার জন্য বারবার বিদ্রোহ করেছে। এসব বিদ্রোহের শক্তি বাঙালি গণমানুষ সহ কৃষকের মজ্জায়–শিরায় প্রবহমান। আবার নিজস্ব উৎসব–পালা–পার্বণ বাঙালি সংস্কৃতিকে স্বতন্ত্র, উজ্জ্বল ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির ঐতিহ্য। এ নববর্ষ উদযাপন পাকিস্তান শাসনামলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধার মুখে পড়েছিল; অথচ সেই নববর্ষ উদযাপন বাংলাদেশ আমলে নতুন চেতনায় বিন্যস্ত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় চেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি চেতনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বাংলা একাডেমির মাসব্যাপী বইমেলা বাঙালি সংস্কৃতিতে সুদূরপ্রসারী ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার উপাদান যুক্ত করেছে। এ চেতনা নাগরিক গন্ডি অতিক্রম করে আজ গ্রাম পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে করেছে। লোকসংস্কৃতির সর্বজনীন ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার সঙ্গে উপযুক্ত নাগরিক চেতনা যুক্ত হয়ে বাঙালি সংস্কৃতি আরও সমন্বয়বাদী ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়েছে। ঈদ, পূজা এর চরিত্রও সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারির শহিদ দিবস আজ আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ভূষিত। ভাষার জন্য জীবন দান যা সর্বজনীন জাতিসত্ত্বার উন্মেষে ও স্বাধীন জাতি–রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের উৎসব আজ সার্বজনীন। লালন উৎসব, লালন মেলা ও বাউলমেলা সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। রামায়ণ উৎসব, মহররম উৎসবসহ আরও শত রকমের পূজা–পালা–পার্বণে ভরপুর বাঙালি সংস্কৃতি। রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। এ কথা বলার কারন হলো বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোর রাজনৈতিক পালাবদলে আমরা দেখেছি বিগত ৫০ বছরে বর্ণিত সার্বজনীন সংস্কৃতির উৎসবে যতবার বাধা এসেছে ততবারই এর ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়ায় আমরা জাতিতে বিভক্তি তৈরি করেছি, ফলে রুচিকর সম্মৃদ্ধ জাতীয় সংস্কৃতির বিপরীতে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক কিংবা আরোপিত সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে, যার প্রান্তিক পরিণতি বলা যায় আজকের রুচির সংকট–সংস্কৃতির সংকট।
হা’ভাতে সংস্কৃতি ও শেষ কথা

বাংলাদেশের সংস্কৃতি হলো গণমানুষের সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, ভোজনরীতি, পোষাক, উৎসব ইত্যাদির মিথষ্ক্রিয়া। শ্রেণি সম্প্রদায়িকতা রোধ করতে না পারলে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ অধরাই থেকে যাবে, আর এর প্রতিক্রিয়া অরুচির মহাযজ্ঞ। ‘আমি’ না ’আমাদের’ সাংস্কৃতিক উত্তরণ না হলে জাতির এই সংকট থেকেই যাবে। সবসময় ভাবতে হবে আমিকে কি ভাবে আমরায় পরিণত করা যায় সে চিন্তায়। আমি যখন আমরা হবো আর সেই সংস্কৃতিই হবে রুচির সংস্কৃতি। এজন্য প্রয়োজন সংঘের, কারণ একা একা রুচির প্রশ্নে কাক্সিক্ষত সফলতা সম্ভব নয়। কেননা ব্যক্তি টেকসই হয় না, টেকসই হয় সংগঠন, তাই সাংগঠনিক সংস্কৃতি চর্চাই আজকের সংকট থেকে উত্তরণের পথ হতে পারে। পরিবর্তন একদম গোড়া থেকেই আনতে হবে। আজ শহরগুলো যেন দেবতার, সেখানে গরিব ও মেহনতি মানুষের স্থান যেন নিকৃষ্ট। ফলে তার সংস্কৃতির উন্নয়ন নিয়ে ভাববার সময় রাষ্ট্রের নেই। আজ আরোপিত শব্দের সংস্কৃতি রোধ এবং প্রভূত্ববাদী শব্দ পরিহার করতে পারলেই রুচির দুয়ার খুলে যাবে। এ কথা তো সত্য যে আমরা ফুল নয় তার গন্ধতে বিমোহিত হই। তাই রাষ্ট্রকে আমাদের সংস্কৃতির রাজ্য তৈরি করতে হবে। চিন্তার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, কেননা চিন্তা করতে শিখলেই মানুষের মুক্তি মেলে। তাই নিজের স্ব–রাজ তৈরির সংস্কৃতি তৈরিই হওয়া উচিত বর্তমান সময়ের অন্যতম এজেন্ডা। জনকন্ঠস্বরের স্বরূপ হিসেবে প্রতিষ্টা করতে পারলেই সংস্কৃতির এই মন্দা থেকে কাটিয়ে উঠতে পারবে জাতি।

সংস্কৃতি কী এ প্রসঙ্গে বিস্তর গবেষণা ও আলোচনা থাকলেও এ প্রসঙ্গে বলা যায়, আমরা যা করি কিংবা আমাদের যা কিছু আছে এবং আমার চারপাশে যা দেখি তাই আমাদের সংস্কৃতি। অর্থাৎ আমি বা আমার জীবনে বহমান সকল বিষয়ই আমার সংস্কৃতির উপাদান। আমি যেভাবে আমাকে দেখতে চাই তাই আমার সংস্কৃতিক বোধ। কোন সমাজে বা ভূ–খন্ডে হাজার হাজার বছর ধরে চলমান জীবন রীতি এবং জীবন ধারাই সেই সমাজ বা ভূ–খন্ডের সংস্কৃতি বলে আখ্যায়িত করা হয়। সেখানকার কৃষ্টি–কালচার, জীবন প্রণালী, শিল্প, ধর্ম, সাহিত্য, লোকাচার, পোষাক–পরিচ্ছেদ এবং ঐতিহ্যর সমষ্টিই বলা হয় সংস্কৃতি। সেই হিসেবে বাংলাদেশ নামক ভূ–খন্ডে বসবাসরত মানুষের সম্মিলিত জীবন বোধ এবং জীবনাচারই বাংলাদেশের সংস্কৃতি বলা যায়। বাংলাদেশ নামক দেশটিতে বসবাসরত মানুষের সাধারণ্য মিল ও প্রাচুর্য সাংস্কৃতিক উপাদান হলো তাদের মুখের ভাষা আর তা হলো বাংলা ভাষা। যদিও দেশে ৫৭ টি আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠি বসবাস করে, যাদের রয়েছে নিজম্ব ভাষা. জীবনাচার, কৃষ্টি ও কালচার তথাপিও তাদের সঙ্গে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠির রয়েছে ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। তারাও দ্বি–ভাষি হিসেবে বাংলায় কথা বলে। তাদের পেশা, কৃষ্টি এবং জীবনাচার অনেকটা বাঙালিদের মতই। সেই অর্থেই হয়তো তারাও বাঙালি এ কথা বলা যেতেই পারে। যদিও এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর মতানৈক্য ও আলোচনা। আমার আলোচনার বিষয়বস্তু আপাতত তা নয় হওয়ায় আমি এ প্রসঙ্গে আলোচনায় ব্যাপৃত না হয়েই বাঙালি সংস্কৃতির ক্রমবিকাশে আজকের হাভাতে সংস্কৃতি এবং রুচির সংকট নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনার অবতারণা করেছি মাত্র।

উৎসব–সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি আজ যেন বিপন্ন এক স্রোতধারায় এগুচ্ছে অনেকটা মহা সংকট মাথায় নিয়ে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে একটা প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে প্রতিভাত হয়েছে যে, বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিক পরিচয় কী কিংবা কেমন হওয়া উচিত ছিল? তার স্বরূপ নির্ণয় করতে গিয়ে আমরা দেখি আদতে বাংলাদেশের সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ বা জাতীয় ধারা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধ্রু¤্রজাল। কিংবা বলা যায় দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেও আমরা বাংলাদেশের জাতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পুষ্ট এবং বেগবান নিজস্ব ধারা তৈরি করতে পারিনি। যা হয়েছে তাহলো ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতিক ধারা। যে সব মহান আদর্শ কে সামনে রেখে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়েছিল, যার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে আমরা আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশেকে পেয়েছি, তার সিংহ ভাগও আমরা জাতীয় জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারিনি। বলা যায় স্বাধীনতার পরপরই জাতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির যে শুভ সূচনা হওয়া উচিত ছিল তা আর কখনো হয়ে ওঠেনি। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর হাত ধরে সবেমাত্র শুরু হলেও তা পচাত্তরের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়াশীলদের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়। এর ফল হয় জাতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী তথাকথিত ধর্মীয় (যদিও এটি ছিল পরিকল্পিত ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ) এবং প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতিক উপাদানের মিশ্রণের মাধ্যমে পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় মদদে মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শ ও লক্ষ্যকে খন্ডবিখন্ড করে চিরায়ত বাঙালি জাতি সত্ত্বাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং হাজার বছরের বাঙালি মানস ও বাঙালির মুক্তির আকাক্সক্ষাকে অবদমিত করা। যেন পৃথিবীতে বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে সমূলে ধ্বংস করাই ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য এ কথা বলা নিশ্চয়ই অতুক্তি হবে না। সেই আর্যবৃত্ত থেকেই এই বাঙালি জাতি সত্ত্বাকে খর্ব করার ইতিহাস আমরা দেখতে পাই। যার সফল বাস্তবায়ন আবারো স্বাধীন বাংলাদেশে পচাত্তরের পর পরই পুরোদমে শুরু হয়।

কবে থেকে আমরা বাঙালি তার সঠিক হিসেব বলা না গেলেও এ কথা বলা যায় খীষ্ট্রপূর্ব ১৫০০ সালে আর্যরা যখন এ ভূ–খন্ডে অনুপ্রবেশ ঘটায় তখনই প্রথম আমরা জানতে পারি বাঙালি ভাষা–ভাষি বাঙালি জনগোষ্ঠির নাম। তারও আগ থেকেই যে বাঙালিরা এ ভূ–খন্ডে বসবাস করে আসছে সেকথা নির্দিধায় বালা যায়। প্রাচীন সেমেটিক জাতির ইতিহাস এবং আদিবাসী সাওঁতালদের প্রাচীন মিথ ও গল্পে আমরা বাঙালি ভাষী জনগোষ্ঠি বা জাতির কথা জানতে পারি (চাষা হাবিব; সাওঁতাল বিদ্রোহ ও দিনাজপুরের সাঁওতাল)। প্রাচীন ইতিহাস চর্চার আলোচনা না করেই আমরা দেখতে চাই এ ভূ–খন্ডের সংস্কৃতিক পরিম–লটি কেমন ছিল। বাংলাদেশের সংস্কৃতির জাতীয় ধারা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলা যায়, সাধারণত বঙ্গ বলতে আজকের বাংলাদেশকেই বোঝাতো বলে বিশেষজ্ঞগণ বলে থাকেন। আজকে আমরা জানতে পারছি হরপ্পা বা মহোঞ্জদারো সভ্যতা ছিল এই অঞ্চলের প্রাচীনতম সভ্যতা। আর এই সভ্যতারই অনন্য উত্তরসূরি বাঙালি তথা বাংলাদেশের সংস্কৃতি, যা আজ রুচির সংকটে নিপোতিত।

ক্ষমতার বলয়ে আজ পৃথিবী আটকে গেছে, সেখানে সব কিছু চলছে ক্ষমতার দখলে। তাই তো ক্রমশ আমারা পরনির্ভশীল হচ্ছি। আপন সংস্কৃতি থেকে সরে যাচ্ছি কিংবা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাঁচার পথ আজ একটাই–সংগঠিত হওয়া, একতা সংস্কৃতিই পারে এ দৈন্যতা থেকে মুক্তি দিতে। মুক্তির পথ যে একতা এ কথা আজ সত্য। যৌথ না হলে আর ভাগ হয়ে এগোনো যাবে না, একলা চললে আর হবে না। আমরা এবং আমাদের নেতৃত্ব ও সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে, কারন নেতৃত্ব হয়েছে আজ কর্তৃত্ব; ফলে সংস্কৃতিই হয়েছে কর্তৃত্বের সফল হন্তারক। মনে রাখতে হবে নেতৃত্ব শব্দটি যৌথ প্রয়াস থেকেই উদ্ভূত। সেখানে একক হওয়ার কোন সুযোগ নেই। নেতৃত্ব একক হলেই তা হয়ে ওঠে কতৃত্ববাদী এবং স্বৈরচার। তাই আমরা দেখছি উন্নয়ন একটি যৌথ শব্দ হলেও উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু বিকাশ হচ্ছে না, কারন উন্নয়নও হয়ে পড়েছে একক সত্ত্বায় আবদ্ধ। আমরা স্বাধীন হয়েছি কিন্তু সার্বভৌমত্ব কি পেয়েছি, স্বাধীনতা একটি সংস্কৃতি। এর জন্য প্রয়োজন সংস্কার। মনে রাখতে হবে ভূমি থেকেই অর্থের উৎপত্তি। ভূমি থেকেই সংস্কৃতি তথা জীবন–জীবিকার উৎপত্তি, তাই তো মানুষকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে আমরা মানুষকে করেছি আরও গরিব এবং সংস্কৃতিকভাবে নিঃস্ব। ভূমি থেকেই মানুষ তৈরি করেছে তার বংশ বুনিয়াদ, তাই প্রয়োজন ভূমিজ সংস্কৃতিক বিপ্লব, তবেই বাংলাদেশ রুচির প্রশ্নে দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পাবে বলে মনে করি। আবার দুর্বৃত্তায়ণের ক্ষমতাকেন্দ্র দখল এবং প্রচলিত চোর–বাটপার আর আত্মহননের গণতন্ত্রও হা’ভাতে সংস্কৃতির ধ্বজাধারী হয়ে সমাজে সর্বত্র অরুচির জন্ম দিয়ে আমাদের আশা আখাক্সক্ষার মুলে পেরেক ঠুকেছে, যেখানে উপর থেকে নিচ সব যেন পচনের শেষ বিন্দুতে পৌছেছে।

এটা চিরন্তন যে, মা কখনো কি স্বৈরাচার হয়। মনে রাখতে হবে তথাকথিত নিরক্ষর বা গ্রামের প্রান্তিক মানুষের মধ্যে বোধ এবং জ্ঞানের সমারোহ খনির মত জমানো আছে। আমরা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষরা শুধু কিছু কলা–কৌশল শিখেছি মাত্র তাও আবার তা চাতুরিপনায় দুষ্ট। ফলে আমরা আধুনিক সংস্কৃতির নামে তৈরি করছি ধু¤্রজাল, যা তৈরি করছে সংকট। এটা তো দিব্যলোকের মতো পরিস্কার যে, ধর্মকে নিয়েও নিরপেক্ষ হওয়া যায়, আবার ধর্মকে বাদ দিয়েও নিরপেক্ষ হওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো আমি কিভাবে নিরপেক্ষ হবো, এটা নির্ভর করে ব্যক্তির বোধ, বুদ্ধি আর বিবেকের উপর। তাই এই সংস্কৃতিবোধ জাগলেই রুচি আপনা–আপানি তৈরি হয়ে যাবে। আমরা সর্বদা সুবিধাবাদী হয়ে থাকি, কখন সুয়োগ পাই এ ধান্ধায়। আর শাসকরা বাণী দেয় ঈশ্বরের মত, আর আমজনতা গোলামীতে সেই বাণীতে যেন বুদ হয়ে থাকে, আর চুষে খায় তারা গরিবের ঘামের দাম। তাই তো কখনও কখনও ওরা নিরক্ষর এসব মানুষকে বলে তারা সচেতন নয়, তাদেরকে চেতন করতে হবে বলে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে আর এর ফায়দা ঘরে তোলে। ফলে সংস্কৃতিক বিপ্লব অধরাই থেকে যায়। এর মাধ্যমে তারা এটা প্রমাণ করতে চায় যে, তারা শিক্ষিত এবং উন্নত চিন্তার মানুষ–তাদের সংস্কৃতি উন্নত। আসলে এটা পুরোটাই হলো শোষণের নব ধাপ্পাবাজী রূপ, এটা একটি রাজনৈতিক খেলাও বটে। যেমনটা ব্রিটিশদের শেখানো বুলি আমরা এখনও আওড়াই আদার বেপারি জাহাজের খবর… আসলে ক্ষমতার এবং শোষণের কারিগররা কখনো চায় না, গরিব এবং প্রকৃত উৎপাদনকারী জাহাজের তথা বাণিজ্যের খবর রাখুক, তাহলে যে তাদের লাভ কমে যাবে। কি ভয়ানক সাম্প্রদায়িকতা একবার চিন্তা করুন। এজন্য আজ প্রয়োজন স্বনিয়ন্ত্রিত এবং নিজ নিজ কাজে নিবদ্ধ সংগঠনের, যারা এ ভ্রান্ত এবং অ–জনকেন্দ্রিক সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে নতুন করে এক জনকেন্দ্রিক বাংলাদেশের সৃষ্টি করবে। বোধকে মুল্যবোধে নিতে হবে। যদি আমার ভিতরের হাজারো বোধকে আমি একত্রিত করে তাকে মুল্যবোধে নিয়ে যাই দেখবো আমার ভাবমূর্তি আমি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। আর এ ভাবমূর্তিই বাঁচিয়ে রাখবে আজীবন, যা আমাকে দেবমূর্তিতে পরিণত করবে।

পারিবারিক সংস্কৃতিক চর্চাই মানুষকে স্বাধীন বা আত্ম–সচেতন করে গড়ে তোলে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে নিয়ন্ত্রণের, এজন্যই কেউ দাস, কেউ বা প্রভু বনে যাচ্ছেন। আমাদের ভাবনায় বরাবরই নিম্নমানের বা এ্যভোব কিংবা লোয়ার, তাই সমতা হচ্ছে না কিংবা ইক্যুয়েলেটি বা ইক্যুইটি আর হচ্ছে না। ফলে সমাজে সংস্কৃতিক বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, যার ফল নিয়ে আজ এত হৈচৈ। পরিবারের চর্চা ছাড়া শিশুর মনন গড়ে ওঠে না, তাই তো আমরা দেখি সকল সরকারি স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়েরর অতি জরুরী একটি অংশ টয়লেট বা কমন ফ্রেসরুম। বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে সর্বোচ্চ রুচির চর্চা হওয়ার কথা অথচ দেশের সব পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় সহ বড় বড় কলেজের টয়লেটে ঢোকা যায় না। এখানেই বোঝা যায় আমাদের রুচির চর্চার কি অবস্থা। এক্ষেত্রে স্কুল কলেজ বিশ^বিদ্যালয়, কি সরকারি, কি বেসরকারি, কি প্রাইভেট, কি সরকারি অফিস–আদালত সর্বত্রই যেন একই চিত্র ফলে নির্দিধায় বলা যায় কিরূপ রুচির চর্চা এবং কি রুচির প্রজন্ম আমরা তৈরি করছি।

মানুষ তৈরি হয় বাড়ি থেকে, বাবা–মার আচরণই প্রকাশ পায় সন্তানের আচরণে। নারীরা তাই তো বরাবরই আত্ম সমার্পিত, যেন স্বয়ং ঈশ্বরই তাদের পক্ষে নাই। এজন্য চাই বৃহত্তর ঐক্য, যেখানে নারীকে করবে সংস্কার এবং শৃঙ্খলমুক্ত। রাষ্ট্র পূর্নগঠনের চিন্তা থেকেই অ–সরকারি অ–লাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্ম। মনে রাখতে হবে শ্রেণি ধন দিয়ে হয়, মন দিয়ে নয়, আর অভিজাত হয় জ্ঞান দিয়ে। মজার ব্যাপার শ্রেণিরা আজ অভিজাত হতে চাচ্ছে, ফলে রাজনীতি সহ সর্বত্র আজ নষ্টামির দেখা। তাই হয় জ্ঞান দিয়ে সমাজ গড়তে হবে অথবা সমাজ থেকে শ্রেণিকে উৎখাত করতে অথবা জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে এর বিলুপ্তি ঘটাতে হবে, কাজটা বেশ কঠিনও বটে। মানুষ তার চারপাশের থেকে শেখে। পৃথিবীকে মানুষ সাজিয়েছে আপন করে। জ্ঞানের চর্চাই হলো রুচির চর্চা, এটাকে সত্য জেনেই কার্যক্রম সাজাতে পারলেই রুচির খরাকে হঠাতে সক্ষম হওয়া যাবে, নচেত নহে।

আয়নার পিছনে পারদ লাগানো হয় নিজেকে দেখার জন্য; দেশ, পৃথিবী আজ বদলে যাচ্ছে, কিন্তু আমি বদলে যাচ্ছি না, তাহলে কি হবে, আবার আমার বদলকে কেউ যদি নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে সেই বদল কিন্তু হয়ে পড়ে প্রতিক্রিয়াশীল। এজন্য রাষ্ট্রকেও বদলাতে হবে। সংস্কার করতে হবে সব নীতি–আইন। শাসকরা আজ এক হয়েছে নিজেদের গোছাতে, তাই আমি মানুষ আজ হাজারো ধারায় বিভক্ত। রাষ্ট্র আজ তাইতো শোষণের হাতিয়ার, অর্থের পাহাড় বানানোর মুলধনী ব্যবসায়। সব সংকট যে রাষ্ট্রের বানানো নাটক। এটা বুঝেই কাজে নামতে হবে। বলা হয় মরণের আগে নাকি ঘুম কম হয়, নাকি অন্য কিছু নাকি ঘুমাতে দেয় না। রাষ্ট্র ইচ্ছে করেই অরুচির চর্চা করে আমাকে করে জ্ঞানপাপী। আমার জ্ঞানপাপে আজ ডুবতে বসেছে আমার সব, রাষ্ট্র আর ভালোরস্রোতে আজ চেপে বসেছে জ্ঞানপাপ। আর এর প্রভাবই হলো আজকের রুচির সংকট।

একটু চোখ মেলে দেখলেই আমরা দেখি, কোথাও রাষ্ট্র কি দিয়েছে নিরাপত্তা ঘরে ঘরে। এখন প্রশ্ন হলো এ ঘর তো আমার, এর নিরাপত্তা কি আমি নিবো না, আমি কি আমার ঘরকে নিরাপদ করবো না, এ ঘরের দেয়াল আমি কি সযত্নে সুরক্ষিত করবো না। ঘরের খুঁটি তাই ভাঙ্গতে হলে ভাঙ্গো, সংস্কারের খড়গকোপে প্রচলিত চাঁদর ছিড়ো। আমাকে বিশ্বাস আজ তুমি কেন করো না, কেন আমি তোমার আস্থাভাজন হই না, এর উত্তর কি আমি খুঁজবো না; এ শিকল কি আমি টুটবো না; নাকি পায়ের বেড়ির মত কোমরেও আমি পরবো রুপোর বিছা। সংকল্পের মাটিতে বীজের অঙ্কুর কি আমি মাটিতে বুনবো না, নাকি প্রশ্নের উত্তরে দিয়ে যাবো বিভ্রান্তির যবান। এভাবেই এই সংকটের উত্তর আমি’ই হয়ে উঠতে পারি আর রচনা করতে পারি সম্মৃদ্ধ আমার বাংলাদেশ।

ভাবাবেগ থেকে বের করতে হবে সবাইকে। পুরোনো স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতির সংরক্ষণ করতে হবে। সমাজ আজ আচ্ছন্ন পশ্চাৎপদতায়, জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে সমাজকে বদলাতে হবে। সংস্কার করতে হবে। মানুষ–প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে। জানাকে গভীর করতে হবে আর তখনিই জানতে আগ্রহ বাড়বে, আর এখানে আমারও অতিরিক্ত দায়িত্ব আছে। তাই সমাধান যোগ্য চিন্তায় নিজেকে নিমগ্ন রাখতে হবে। আজ যদি আমি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চাই তবে আমাকে অবশ্যই জানতে হবে। আমার জ্ঞান পাপে আজ ডুবতে বসেছে আমার সব। আমাকে গরীব করে রাখা হয়েছে তাই আমি গরীব। নিজেকে নির্মাণ করতে হলে সবকটা জানালা খুলে দিয়ে, প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে নিজেরে প্রাণিত করে হতে হবে প্রাণময়, তবেই রুচির সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব, না হলে নয়। মনে রাখতে হবে বহুর মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারলে আত্মোপলব্ধি সহজতর হয়। ‘আমি’ সত্ত্বাকে পরিহার করে ‘আমাদের’ সত্ত্বার লালন হতে পারে বর্তমান মানব সংকটের উত্তরণের অন্যতম পথ। আমাদের বোধের বিকাশ ছাড়া এই সংকট থেকে আমরা কখনই বের হতে পারবো না। আমাদের সংস্কৃতির মাধ্যমেই সামষ্টিক রুচি সম্ভব।

যতবেশি আকর্শিত হওয়া যায় ততবেশি প্রভাব তৈরি করা যায়। মনে রাখতে হবে আদর্শ একটি মানদ–। আদর্শের ব্যবহারিক প্রয়োগ বা রূপ বা চর্চা হলো মূল্যবোধ। যেমন– গণতন্ত্র হলো আদর্শ আর মূল্যবোধ হলো কোন কাজ করার জন্য সকল সদস্যদের মতামতকে গ্রহণ করা বা সমবেত মতামত নিয়ে কাজ করা হলো মূল্যবোধ। মূল্যবোধ হলো আদর্শের মানদন্ডে পরিমাপ করা। সাংগঠনিক মূল্যবোধ একটি আদর্শ আবার ঐক্যমত হওয়া একটি মূল্যবোধ, বোধের ঐক্যমত একটি সাংগঠনিক মূল্যবোধ। মনে রাখতে হবে কাজের সংস্কৃতি তৈরি করার মাধ্যমেই কেবল বর্তমান সংকট থেকে জাতি পরিত্রাণ পেতে পারে।

এই রুচির সংকটে তাই এখনই দরকার–

  • রাষ্ট্রের এক মুখী শিক্ষা কাঠামো।
  • জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ।
  • জাতয়িতাবাদী মননের সর্বত্র সমান পরিচর্চা ও পরিকাঠামো নির্মাণ।
  • মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও মুল্যবোধের সমাজ বিনির্মাণ।
  • সমান সুযোগের সফল ব্যবহার।
  • তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ স্তর ব্যাপি এক ধারার সংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় চর্চা।
  • রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক উন্মেষ।
  • পারিবারকে একক ধরে রাষ্ট্র মেরামত ও কল্যাণ রাষ্ট্রের নির্মাণ।
  • প্রমিত সংস্কৃতির ধারার সমাজ কাঠামো পুননির্মাণ।
  • চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতির শহুরে অভিযোজনে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল আচরণ ও পরিচর্চা।
  • পরিকল্পিত গ্রামায়ণ কর্মসূচি গ্রহণ
  • আমি সর্বস্ব সংস্কৃতির স্থলে আমাদের সামষ্টিক সংস্কৃতির বিনির্মাণ।

আর এই জাতীয় সংস্কৃতি নির্মাণে এখনই যা করা উচিত বলে মনে করছি–

  • শিক্ষার সকল স্তরে (স্কুল–কলেজ–মাদ্রাসা ও বিশ^বিদ্যালয়) জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করা।
  • সকল সরকারি–বেসরকারি এবং প্রাইভেট অফিস জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে কর্মদিবস শুরু করা।
  • সংসদদের সকল সভা, সেমিনার, জনসভা এবং অধিবেশনে জাতীয় সংগীত পরিবেশনা বাধ্যতামুলক করা।
  • সকল রেডিও টিভি চ্যানেলে (সরকারি–বেসরকারি) জাতীয় সংগীত সহ জাতীয় দিবস নিয়ে বিশেষ
  • অনুষ্ঠানমালা প্রচার বাধ্যতামুলক করা।
  • ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা-জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশনের এর সকল সভা সেমিনার এবং অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত চর্চা বাধ্যতামুলক করা।
  • জাতীয় দিবসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি না দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বাদ দিয়ে দিবস উদযাপন নিয়ে অনুষ্ঠানমালা আয়োজন এর ব্যবস্থা বাধ্যতামুলক করা।
  • জাতীয় বাজেট ১বৈশাখে প্রদান এবং অর্থ বছর বৈশাখ হতে চৈত্র করা (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি বিজ্ঞান সমম্মত বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন)।
  • জাতীয় সংস্কৃতি নির্মাণে গ্রামীণ ও চিরায়ত সংস্কৃতির বিকাশে জাতীয় কর্মকৌশল, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা।
  • ১০ এপ্রিল প্রজাতন্ত্র দিবস করা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল দিবস ও স্মৃতিকে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করা
  • মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত গণহত্যা, গণকবর ও অন্যান্য বিষয়ক সকল স্মৃতিকে জাতীয় সংস্কৃতির মোড়কে একীভূত করা।
  • জাতীয় কবির সাংস্কৃতিক আদর্শকে জাতীয় রূপ দেওয়া।
  • সর্বজনীন সংস্কৃতির বিকাশে বাধ্যতামূলক কৌশল প্রণয়ন এবং বাংলাদেশী–বাঙালি কৃষ্টির জাতীয়করণ।

চাষা হাবিব
কবি ও গবেষক
সম্পাদক– বাহে’ সাহিত্যপত্রিকা

RELATED ARTICLES

5 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments