মাহবুব আলী: অস্তিত্বের পলায়নে বোনে অযোগ্যতার আখ্যান
বলাহয়ে থাকে, যে কোনো স্তরেরশিল্পকর্ম বা সাহিত্যকর্ম বা যে কোনো পর্যায়ের শিল্পীর জন্যে অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে নিজের শ্রেণিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং নিজেকে নিজের লোকালয়ের জনগণের সাথে মিশিয়ে ফেলা; তবে এই মিশ্রণের সময় শিল্পীকে আবশ্যিকভাবে স্মরণ রাখতে হয় সময় ও বাস্তবতাকে, স্মরণ রাখতে হয় শিল্পীর মস্তিস্ক্যের সক্ষমতাকে, নিজের সেরেব্রাল কোটেক্টকে। কারণ মনে রাখতে না পারলে বড় ভুলে তিনি ভুলেই যান যে, সে অথবা তিনি তার জনতারই অংশমাত্র। ফলে শিল্পী মনের অজান্তেই সরে যান মূল থেকে। এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে, জনাংশের ভগ্নাংশ হতে না পারলে একজন মননশীল ব্যক্তি, শিল্পী বা সাহিত্যিক তাঁর সাবলিমিটির চূড়াকে স্পর্শ করতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্পর্শ তো দূরের কথা অনুভূতির এককও নির্মান করতে পারেন না। ফলে তা নিতান্তই হৃদকথায় পরিণত হয়ে ওঠে। এখানে এ কথাও মনে রাখতে হবে একজন শিল্পীকে যাবতীয় হঠকারীতা এবং সুবিধাবাদ হতে যোজন-ফ্যাদম দূরে অবস্থান করতে হয় এবং করা উচিত, না হলে আত্মমগ্নতা এবং বাস্তবতার মাঝে সৃষ্ট হয় কিংবা ধরে ভয়াবহ ফাটল, আর এ ফাটল শিল্পীকে ধ্বংস করে, কারন রচনা নির্মাণকালীন শিল্পীর কাছে আত্মমগ্নতাই প্রবল হয়ে ওঠে। এই আত্মমগ্নতার সময়ই হলো তার নির্মাণের উপযুক্ত সময়। এই সময় তার জ্ঞান বাস্তুচ্যুত হলেই সর্বনাশ যেমনটা আমরা অহরহ দেখছি। এক্ষেত্রে নিংসন্দেহে গল্পকার মাহবুব আলী দিনাজপুরের মত রাজধানী থেকে দূরবর্তী একটি মফসল শহরে থেকে সেই গল্পের প্লটকে যথার্থ করেই নির্মান করেছেন এ কথা আমরা বলতেই পারি।
গল্পকার মাহবুব আলী-র জন্ম উত্তরের ঐতিহ্যবাহী জনপদ দিনাজপুর শহরে। তৎকালীন দিনাজপুর বারের আইনজীবি অ্যাডভোকেট এম. এ. মজিদ এবং গৃহিনী মেহের নেগার দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যোষ্ঠ সন্তান মাহবুব আলী। বলা যায় একবারে শৈশবেই লেখালেখির সূচনা, তবে ক্লাস নাইন থেকেই লেখালেখির শুভসূচনা বলে তিনি লেখককে জানান। তিনি বলেন আদতে তাঁর লেখক হওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। বাড়িতে বাবার বেশকিছু বইয়ের কালেকশন ছিল, সময়ে সেসব পড়তাম। তিনি বলেন “বইপড়ার নেশা আমার স্কুল থেকে। আজকের হেমায়েত আলী হল আগে যা খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল অ্যা- পাবলিক লাইব্রেরি ছিল, সেখানটায় প্রতিদিন আমার বইপড়া চলত স্কুল ছুটির পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত। ক্লাস নাইনে আমি এর মেম্বার হই, সে-সময়ে অনেক বই পড়া হয়, যা এভেইলেবল ছিল, তখন বাংলাদেশি লেখকের বই তেমন ছিল না। আমার নানা শেখ নিয়াজ উদ্দিন চৌধুরি, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারি ছিলেন, তার মাধ্যমে গার্লস স্কুলের লাইব্রেরির অনেক বই পড়া হয়। আমার বাবা পাঠ্যবই ছাড়া গল্পের বই কিনে দেন নাই, পয়সা জমিয়ে বই আমি কিনতাম। আমার কেনা প্রথম বইয়ের নাম ছিল পিঙ্গল বিকেলের আয়নায়” বলে লেখককে তিনি জানান। মুলত কৈশোরের দূরন্তপনা এবং সেসময়ের গোয়েন্দা সিরিজ বইসমূহই তার লেখালেখির জগত তৈরি করে দেয় বলে তিনি বলেন। তাঁর বাবার হাত ধরে দিনাজপুরের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল (বাংলা স্কুল) এ অনুপ্রবেশ এরপর এখান থেকে এসএসসি; পরে দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং বিএ (পাস) করেন। উচ্চতর শিক্ষা লাভের বাসনায় তিনি রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাস্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেন। পেশাগত জীবনে নানাবিধ পেশায় যুক্ত হলেও তিনি চাকরি জীবনে শিক্ষকতা পেশায় থিতু হন এবং সেখান থেকেই অবসর গ্রহন করে বর্তমানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে গল্প, উপন্যাস ও ফিচার লিখে
যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত এ গল্পকারের মোট ৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। অস্তিত্বের পলায়ন, অযোগ্যতার সংজ্ঞা, ভয়, পিঙ্গল বিকেলের আয়না, রাত পাহারা চোখ, গোপনীয়তার অলিগলি এবং ছোট গল্পের নির্মানশৈলী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বের সহিত উল্লেখ না করলেই নয় যে, তাঁর প্রতিটি গ্রন্থের প্রচ্ছদ পরিকল্পনা লেখক নিজেই করেছেন। তিনি একজন উচুমাপের চিত্রশিল্পী এ কথা বলা নিশ্চয়ই অতুক্তি হবে না।
লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, তার প্রথম লেখা ‘একটি ছড়া’ প্রকাশিত হয় ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী সম্পাদিত তৎকালীন সাড়া জাগানো অর্ধ-সাপ্তাহিক দেশবাংলা’র শিশু-কিশোর পাতায় নভেম্বর ১৯৭৩-এর সংখ্যায়। এরপর তাঁর প্রথম গল্প The Slave’ প্রকাশিত হয় সেপ্টেম্বর ১৯৭৪-এ The Daily Observer- এর Young Observer বিভাগে। তারপর আর থেকে আর থেমে থাকেননি। শত প্রতিকূলতা সত্বেও তিনি লিখেছেন সমান তালে। পেশাগত কারণে তিনি সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা এবং এনজিও কর্মকর্তা হিসাবে বিভিন্ন পদে থেকে চাকরি করেছেন। তিনি দৈনিক পূর্বদেশ-এর শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর দিনাজপুর জেলা শাখা-র উদ্যোক্তা আহ্বায়ক হিসেবে সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ থেকে জানুয়ারি ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সাংগঠনিক ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া দিনাজপুরের সাহিত্য সংগঠন ‘উত্তর তরঙ্গ’- এর অন্যতম উদ্যোক্তা সাহিত্য সম্পাদক এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
গল্পকার মাহবুব আলী ছাত্র থাকাকালীন স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকা যেমন: দৈনিক পূর্বদেশের চাঁদের হাট, ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর, The Bangladesh Times -এর Junior Times, The Bangladesh Observer -এর Young Observer, শিশু-কিশোর পত্রিকা নবারুণ এবং স্থানীয় দৈনিক উত্তরা, দৈনিক প্রতিদিন, সাপ্তাহিক জনমত, সাপ্তাহিক পুনর্ভবা ইত্যাদিতে ছড়া-কবিতা-গল্প লেখেন ও আঁকেন। সাম্প্রতিক বিষয়সমুহের উপর বেশকিছু সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় ও ফিচার লিখেছেন স্থানীয় ও ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায়, এর মধ্যে দৈনিক উত্তরা, দৈনিক জনমত, দৈনিক করতোয়া, দৈনিক যায় যায় দিন, দৈনিক খোলা কাগজ এবং বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের নিরীক্ষা উল্লেখযোগ্য।
তাঁর গল্পে আমরা দেখি শহুরে জীবন-যাপনের পাশাপাশি একবারেই নিটল গ্রামীণ জীবনে চিত্রকল্প, যদিও আঞ্চলিক কথোপকথনে ভাষাগত দূর্বলতা কিংবা আঞ্চলিক কথ্যরীতিতে অন্য অঞ্চলের কথোপকথন ঢুকে যাওয়ায় শুদ্ধ আঞ্চলিক ভাষারীতি ব্যবহারে কিছুটা শীতিলতা কিংবা লেখকের উচ্ছাকৃত সৃষ্টি বলে পরিলক্ষিত হয়। তথাপিও তাঁর গল্পে আমরা অনন্য আঞ্চলিক রসবোধের সন্ধান পাই। পাই গ্রামীণ জনজীবনের অকৃত্রিম চিত্রপট। বিশেষ করে তিনি নিজে চোখের সামনে দেখেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধ, যদিও লেখক অকপটে বলেন যে, তিনি তখন স্কুলের ছাত্র, মুক্তিযুদ্ধকে তেমন করে দেখা বা বোঝা কিংবা কি ঘটতে যাচ্ছে তা খুব একটা বুঝতে পারননি, আর বোঝার বয়সও ছিলনা বলাই যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের পরিবার দিনাজপুর শহরেই ছিল বলে তিনি লেখককে জানান। তেমন প্রত্যক্ষ যুদ্ধ অভিজ্ঞতা যদিও তাঁর নেই। কিন্তু সৃজনী উৎকর্ষতার মাধ্যমে তার গল্পে এসেছে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের ভাঙ্গন, পারিবারিক জীবনে সুস্থিরতার অভাব ইত্যাদি যা তাঁর গল্পের অন্যতম রসদও বটে। তাইতো তাঁর গল্পে এসব বিষয় উঠে এসেছে বারংবার। বারবার ওঠে এসেছে তাঁর সেসময়ের গল্পে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সামাজিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং সামগ্রিকভাবে মূল্যবোধের চরম ধ্বসনামা অবক্ষয়কে বিষয়বস্তু করে একাধিক গল্প প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বিভিন্ন পত্রিকায়। আমরা জানি যে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ছোটগল্পে একটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে জীবনদৃষ্টির পরিবর্তন। সমাজের উঁচু তলার মানুষের পাশাপাশি নিচুতলার মানুষও তখন গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান লাভ করে। যা মাহবুব আলীর গল্পে পরিদুষ্ট হয়। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে রাজনৈতিক ভাঙ্গাগড়া এবং শোষণ-বঞ্চনা বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি তেমন ঘটেনি একথা বলা নিশ্চয় অতুক্তি হবে না। তবে এর মধ্য দিয়েই গজিয়ে ওঠে একটি উচ্চবিত্ত শ্রেণি। তাদের জীবনও ছোটগল্পে ঠাঁই পেয়েছে নানাভাবে। এসব বিষয়ের চমৎকার উপস্থাপনা দেখি আমরা মাহবুব আলীর বিভিন্ন গল্পে।
যেহেতু লেখক এনজিও কর্মী হিসাবে গ্রামের প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন তিনি। তাই তো তিনি প্রান্তিক দারিদ্র্যক্লিষ্ট ভূমিহীন কৃষক, জোতদার ও মহাজনের শোষণ-পীড়ন, রাজনৈতিক ফড়িয়া, দালাল ও ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিভ্রান্ত-বিপর্যস্ত গ্রামবাংলার লোকদের কথা তাঁর ছোটগল্পে এঁকেছেন অনুপম চিত্রকল্পে। এসেছে চল্লিশ-পঞ্চাশ দশক থেকেই বয়ে চলা সেই গল্পের ধারাবাহিকতায় তাঁর গল্পে, যা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছেন বলে আলাপচারিতায় বলে থাকেন। আর সব গল্পকারের মতো স্বাধীনতা পরবর্তী ছোটগল্পের ধারায় তিনিও এদের কথা অনেকটা সহানুভূতির সঙ্গে বর্ণনা করেছেন তাঁর বিভিন্ন গল্পে। তাই বলা যায় এনজিও বেসড গল্পগুলো যেমন অযোগ্যতার সংজ্ঞা, ভয়, পিঙ্গল বিকেলের আয়না, রাত পাহারা চোখ, গোপনীয়তার অলিগলি প্রভৃতি লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বয়ান।
মাহবুব আলীকে লেখক, গল্পকার কিংবা সাহিত্যিক যে নামেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন তিনি একজন স্বভাব গল্পকার একথা বলাই সমীচিন এবং যুক্তিসংগত। গল্প বলা তার জীবনের নিত্য অনুসঙ্গ। প্রচারবিমুখ নিভৃতচারী এই গল্পকার একান্ত মনের শব্দ ভৈরবীতে বুনে চলেছেন শব্দের অনন্য বুনট। রচনা করেছেন অসংখ্য গল্প, ঔপন্যাস এবং প্রবন্ধ। সম্প্রতি বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে তাঁর বেশকটি গল্প ও প্রবন্ধ। বলা যায় প্রকৃতি সংলগ্ন মনোজগত এবং বাস্তবতায় জর্জরিত মানস তাঁর গল্পের শেকড়। যেনো শেকড় ছড়িয়ে প্লবিত উদ্ভিদ হয়ে যুক্ত হয় হাজারো পত্র-পল্লবে, আর লেখকের প্রকৃতি সংলগ্ন আত্মপোলব্ধি ছড়িয়ে যায় জীবন ও সমাজের আনাচে-কানাচে রন্ধ্র থেকে রন্ধ্রে। তখন প্রেম হয়ে ওঠে বৈশ্বিক ও আর অতিপ্রাকৃত ভাবনা। অথচ সতত আততায়ীর সংশয় বিপন্ন করে লেখককে। প্রকৃতি প্রেমের অনুভব ও উপলব্ধি বহুমাত্রায় বিকশিত করার বিরল নৈপুণ্য তিনি দেখিয়েছেন তাঁর গল্পে। তিনি ‘ভায়োলিন কেন কাঁদে’গল্পে বলে চলেন ‘মরণের আগে মুখে জল দিতে কেউ আসে না। সবাই কফিনের উপর ফুল ছড়াতে ভালোবাসে।’
জীবন, প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতার আর্তী নিয়ে এ চেতনাচাষি, মানুষের মনন অনুশীলনে জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং মানবিক সৌন্দর্য প্রিয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে সত্য প্রিয়তা ও জীবন প্রকৃতির উচ্চারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাচ্ছন্দ্য সমাজ অর্ন্তগত মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার আকুতি যেনো নবরুপ পেয়েছে গল্পকারের চিন্তায়-চেতনায়, যার সফল এবং মূর্ত ব্যঞ্জনার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় তাঁর আটটি গল্পগ্রন্থের বিভিন্ন গল্পে। তাঁর গল্পে অন্তরলোকের এক উদ্ভাস অনন্য মানস সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ পাঠককে করে ব্যাপকভাবে আলোড়িত, করে ভাবনার বুননের নতুন নতুন কারসাজিতে পাঠক হয়ে পড়ে বিমোহিত। তিনি যেন সকল মানুষের হয়ে বুনে চলেন আত্মশক্তি আর আত্মমুক্তির গান আর সর্ন্তপনে এঁকে দেন এক ফেলে আসা অতীত এবং অদেখা কিছুটা অজানা জগতের অর্ন্তছবি। যেখানে পাঠক মাত্রই হয়ে পড়েন আন্তঃজালিক ঐন্দ্রলিক নষ্টালজিয়ায় মোহাচ্ছন্ন; যেনো মাহবুব আলী গল্পে বুনে চলেন আমাদের চিরচেনা চারপাশকে। তাই তো তাঁর ভালোবাসা ও গুবরে পোকায় তিনি তাঁর গল্পের নায়ক শিহাবের বয়নে বলে চলেন- “সূর্য হলো সত্যের মতো, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যায় না; দু’চোখে অন্ধ হয়ে পড়ে। অনেক সময় চরম কোনো সত্য কাউকে অন্ধ করে দেয়। তার সহ্য করার ক্ষমতা থাকে না। সে তখন মিথ্যের উপর দাঁড়িয়ে শতরকম ভাবে। তাকে পরিক্রমণ করতে করতে গোলকধাঁধায় গ্রহাণুতে রুপান্তরিত হয়। ততক্ষণ জীবন থেকে সব সরে যায়। হারিয়ে যাওয়া সময় আর ফেরে না। তার মধ্যে এ রকম ভাবনায় আত্মশ্লাঘার অনুরণন দানা বেঁধে ওঠে। নিজেকে মহৎ ভাববার কল্পিত গফ খুঁজে পায়।”
তাঁর চরিত্র চিত্রনেও তিনি বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। যেনো একবারে আমাদের চিরচেনা সব চরিত্র, শিহাব, রুকু, মজিবর, শ্যামল, তমারলরা যেন পাঠকের একবারে আপন পরিচিত আত্মীয়-স্বজন। যারা ঘুরে বেড়ান দিনাজপুরের চিরিবন্দর-পার্বতীপুর-ফুলবাড়ি সহ বৃহত্তর দিনাজপুরের চেনা অলিগলি সব পথ। মাহবুব আলীর গল্প সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আহমেদ তানভীর তার ‘মাহবুব আলীর গল্প : জীবনদর্শনের নান্দনিক শব্দছবি’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন- মাহবুব আলীর গল্পে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে চমৎকার চিত্রকল্প, জীবন-বাস্তবতা আর একান্ত দর্শন। যেমন: ‘হলুদ এক প্রজাপতি বদ্ধ অন্ধকার থেকে বেরোবার পথ খুঁজে চলে’- [নিষিদ্ধ গন্দমের জন্ম]
‘ভালোবাসায় কোনো সন্দেহ চলে না’- [ভালোবাসা ও একটি গোবরেপোকা]
‘আমরা তো সাপের প্যাটের মধ্যেই হজম হইতাছি’ ‘পৃথিবী ভারি অদ্ভুত জায়গা! মানুষ আর তার বেঁচে
থাকার হাজার নিয়মকানুন বড় আজিব। একজন আর একজনকে সাপের মতো প্যাঁচ দিয়ে চেপে ধরে থাকে। অজগর। একটু একটু করে কষ্ট দিয়ে গিলে খায়।’ ‘সময় হলো নদীর জল… একবার শুধু স্পর্শ করা যায়।’ ‘দিনে দিনে কত যে সহনীয় হতে হয়। কত সমঝোতা বেঁচে থাকার জন্য।’- [করোটির নীলপদ্ম]
‘জগৎ এমনই, সুযোগবাজরা সবসময় সুবিধে নেবে। মার খাওয়া মানুষ অন্য গাল এগিয়ে দেবে, এটাই নিয়ম।
: একদিন বিদ্রোহ হবে। ইতিহাসের শিক্ষা। তখন আমরা থাকব না।
: তারপর আবার নব্য সুযোগবাজ। এই তো ইতিহাস…’- [যতিহীন পিছুফেরা]
মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দছবিও প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠেছে মাহবুব আলীর লেখায়: ‘আমি কলেজে পড়তাম। এখন মানুষের জুতো রং করি। যুদ্ধে কতকিছু বদলে গেল।’- [যতিহীন পিছুফেরা]
আবার তাঁর ‘ভয়’ শীর্ষক বইয়ের ‘স্বপ্নের আত্মহনন’ গল্পে তিনি চিত্রকল্প এঁকেছেন আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে। আঞ্চলিক ভাষার সুনিপুণ ব্যবহার আর নাটকের দৃশ্যের মতো বিভাজন নতুন আবহ দিয়েছে গল্পটিকে। এ বইয়ের নামগল্পে
বর্তমান সমাজের এক নন্দিত অন্ধকারের বয়ান প্রতিভাত হয়েছে এভাবে: ‘সে পারতপক্ষে কাজে কোনো ফাঁকি দেয়নি। সে ওটা করতে পারে না। সবাই ফাঁকি দেয়ার লোক নয়। যেমন কেউ কেউ নকল করতে পারে না। শিক্ষাজীবনে কতজনকে তো দেখল, নকল চালিয়ে রেজাল্ট ভালো করে ফেলেছে। আজ তারা কত বড় বড় পদে চাকরি করে। সে মাথা ঘুরে দেখতে পারেনি পরীক্ষার খাতায় কে কী লিখল। তাদের টাকা আছে। উচ্চশিক্ষা বা ভালো চাকরি পেতে কষ্ট হয়নি। তার টাকা নেই। পড়ালেখা আর হল না।’
‘তুমি কেন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারোনি’ একটি দহনের গল্প, না-পাওয়া আর চাপা ক্রোধের গল্প। এর পাঠ বেশ ভালো লাগায় আবেশিত করে পাঠকমনকে। (আহমেদ তানভীর, ‘মাহবুব আলীর গল্প : জীবনদর্শনের নান্দনিক শব্দছবি’)
তেমনি আবার লেখকের ‘গোপনীয়তার অলিগলি’‘বইয়ের ‘কাপুরুষের অহংকার’গল্পে এক ঝরঝরে সুন্দর চিত্রকল্পে গল্পকে উপস্থাপন করেছেন। জীবনের টানাপোড়েনের গল্প পড়তে পড়তে মনে হয়- অভাব এক অদৃশ্য হাঙর। শোষণ, নিপীড়ন, ক্ষমতার গল্প এই ‘কাপুরুষের অহংকার’। অসহ্য এক সত্য বিবৃত হয়েছে এ গল্পে : ‘দুনিয়া এখন শয়তানের। যে যত বদমাশ সে তত সুখে থাকে।’ ‘টাকা হল নগদ নারায়ণ! কবরের মুর্দাও টাকার গন্ধ পেলে হাত বাড়িয়ে দেয়।’ এভাবেই তাঁর বিভিন্ন গল্পে আমরা দেখি জীবন ঘনিষ্ট যাপিত জীবনের অনন্য বয়ান।
বিভিন্নজনের কাছে জীবনের মানে বিভিন্ন রকম, বোধের পার্থক্যও স্পষ্টগত ভিন্ন ভিন্ন এবং এটাই বাস্তবতা; আর এজন্যই সাহিত্য নিরন্তর সৌন্দর্য সাধনার অনিঃশেষ খোরাক এ তথা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। সময়ের ব্যবধানে, জাগতিক বৈচিত্র্যে, বাস্তবতা ও পরিবেশের রকম ফেরে নানাবিধ ডালপালা মেলে জীবন যেমন রহস্যবৃক্ষ, তেমনি প্রতিটি মানুষের রয়েছে হাজারো গল্পের প্লট। বলা হয় যে, প্রতিটি মানুষই একেকটি গল্প। প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে গল্পের চরিত্রের মতো সামগ্রিক অভিজ্ঞতা, আর মাহবুব আলী যেনো এখানটাতেই সেই প্রতিটি মানুষের গল্প রচনা করে চলছেন দীর্ঘ সময় ধরে। সৌন্দর্য সম্পর্কে যেমন চূড়ান্ত কিছু হয় না, গল্প বা কাহিনী সম্পর্কেও ঠিক শেষ কথা বলা যায় না। সময় যেমন পরিবর্তনশীল, সময়ের সাথে সাথে মন, মনন, সময়ের ভাষা, শব্দচয়ন, অঙ্গসৌষ্ঠব, ভাবের বিন্যাস সেরকম পরিবর্তশীল বলেই আমরা বিভিন্ন জনগল্পকার বা লেখকের মধ্যে বিভিন্ন ফরমেটে গল্পকে উপস্থাপন করতে দেখি। এখানেই গল্পকার ঘটনা উপস্থাপন শৈলীর জন্য হয়ে উঠেন আধুনিক, পুনরাধুনিক বা উত্তরাধুনিক যে নামেই বলি না কেন সেই অবজেক্টে। আসলে এ কথা আর
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আধুনিক ভাষা ও তার শব্দ এবং গঠন ও বিষয়ানুযায়ী সময়ের প্রেক্ষাপট গল্পকারের হাতেই হয়ে ওঠে সজিব হয়ে প্রাণবন্ত আখ্যানে। এখানে আমরা দেখি গল্পকার মাহবুব আলী তাঁর সময়ের প্রচলিত ঢঙেই তাঁর গল্পের প্লট নির্মান করেই গল্প রচনায় ব্যাপৃত হয়েছেন। তাই তো তিনি তাঁর ‘করোটির নীলপদ্ম’ গল্পে বলে চলেন গল্পের ছলে ভাতিজার কাছে উত্তর পুরুষের ফেলে আসা সেই পথ, সেই জীবন, যেন যা আমরা হারিয়ে এগিয়ে চলি প্রগতির পথে। তিনি বলেন- “সেখানে কোন এক পাহাড়ের কোলে শুয়ে আছে সুড়ঙ্গ। মশাল জে¦লে নিচে নেমে যেতে হবে। তারপর গভীর টলটল জলের বিশাল দিঘী, যার বুকে জোছনা ধোয়া আলোর ছবি হয়ে জেগে আছে নীলপদ্ম… জীবন সুখের মন্ত্র। কিন্তু কিভাবে যাবে… যেতে পারবে? দোতারায় টোকা পড়ে। থেমে যায় মূর্ছনা।…” এভাবেই তিনি গল্পের পর গল্প বুনে যান স্বদেশী মন্ত্রে।
তাঁর গল্পের নানাবিধ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ‘শব্দপ্রয়োগে দ্বিধাহীনতা’ অন্যতম বলা যায়। আবার না বলা কথাকেও প্রশ্নাকারে তুলে ধরতে লেখক বেশ সাহসী। যেমন : ‘যারা মেধাবী, তারা এট্টু-আধটু ওরকমই হয়। এতে দুষের কিছু না। দেখছেন না বড় বড় রাইটার-শিল্পী সব কেমন মাদারচোদ্-লুচ্চা।’ [‘চাঁদের দেয়ালে ক্যাকটাস’] ‘ইলিশ বিদেশে রফতানি করা হয়। কেন? সাগরে জলদস্যু আর চোরাকারবারিদের গুলি করা যায় না? ভারত তো সীমান্তে মানুষ মেরে শেষ করে দেয়।’- [স্খলনের মানচিত্র]
এভাবেই তিনি যেনে বলে চলেন জীবনের সহজ দর্শন : ‘জীবন হল হিসাবের খাতা। গানের খাতা নয়। জীবন হল জুয়া। সতর্ক থাকতে হয় প্রতিটি মুহূর্ত।’ আবার ‘পৃথিবীতে মানুষ বহু নটির সতীপনা দেখে। সেই দেখা না দেখায় কারও কোনো যায় আসে না।- [তিক্ততার শেষ কিস্তি]
‘এই দেশে গাধাকেও ঘোড়া বলে চালান যায়। কথার জাদুতে গম চোর আর ডাকাতেরা কত কী হবার
পারে।- [অন্ধকারের বাজার]
‘চোরের সমাজে সত্যবাদী হয়ে যত বিপত্তি।- [সুখের আন্ধারশূলা]
‘বেচারা সক্রেটিস… মহাকালের বুদ্ধু। মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। আবেগ ভালোবাসা। বাস্তব সত্য এই যে, বেশিরভাগ মানুষ ইতর
প্রকৃতির।- [অযোগ্যতার সংজ্ঞা]
‘বোকা মানুষ দাগা খেয়ে একে-ওকে বলে বেড়ায়, চালাকেরা বনজঙ্গলে গিয়ে কাঁদে।- [র্যাঁদা]
গল্প লেখা ব্যাপারটা আসলে জীবন ও জড়ের সঙ্গে চৈতন্যের সংগ্রাম, ভাবনার সঙ্গে ভাষার ও ভাষার সঙ্গে ছন্দ, অলঙ্কার ও ধ্বণি মাধুর্যের এক বিরামহীন বাগযুদ্ধ যেখানে চরিত্র চিত্রনের মাধ্যমে লেখক তাঁর প্রেক্ষিতকে তুলে ধরেন সরস বাকভঙ্গি এবং চিত্তাাকর্ষক বাচনিক উপস্থাপনায়। তাই তো এখানে প্রকরণগত চেতনা গল্পের জন্য অপরিহার্য উপাদান। এক অর্থে প্রকরণই গল্পকারের আত্মপরিচয়। কিন্তু প্রকৃত আশ্রয় তার বিষয়বস্তু, যার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য গল্পের মূল বলে ধরে নেওয়া হয়, যা অনেকখানি গল্পের স্বার্থকথাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ বিবেচনায় মাহবুব আলীর গল্প বক্তব্যধর্মী হলেও কখনো কখনো কিছু কিছু গল্পে তার উপস্থাপনাগত দূর্বলতার কারনে গল্পের চবিত্রকে সবল না করে কিছুটা দূর্বল করেছে বলে প্রতিয়মান। আবার আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগেও অন্য অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে অনাবশ্যক মিশ্রণ দেখা যায় কয়েকটির গল্পের বিভিন্ন সংলাপ রচনায়, যা শিল্পের মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মনে হয়েছে। তবে তাঁর ‘উচ্ছেদ’, ‘রাত পাহারা চোখ’, ‘অযোগ্যতার সংজ্ঞা’, ‘মালাবদল’ ও ‘প্রপঞ্চকথন’ গল্পগুলেতে লেখক অসাধারণ বাগ্মিতায় আঞ্চলিক ভাষার সার্থক উপস্থাপনা করেছেন। নিশ্চয়ই গল্পকার আগামিতে এসব বিষয়ে আরও সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন কিংবা বলা যায় এসবিই লেখকের নির্মান কৌশলের অংশবিশেষ।
বলা হয়ে থাকে গল্পকারের যুগযন্ত্রণা তার নিত্যসঙ্গী। আর সেই বেদনার বহিঃপ্রকাশ তাঁর শিল্পকর্ম গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, যেমনটা আমরা মাহবুব আলীর ‘অস্তিত্বের পলায়ন, ‘নিষিদ্ধ গন্ধমের জন্ম,‘ যতিহীন পিছুফেরা’, বিষ নীল আতর কিংবা ‘অযোগ্যতার সংজ্ঞা প্রভৃতি গল্পে দেখতে পাই। আবেগে মানুষ যে কতটা তাড়িত হয়! তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এসব গল্প। মানুষ যে সৃষ্টি জগতের অন্তরালে ক্রীড়ানড়ক হয়ে ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে তার অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলে, সংশয়, যুক্তি, বুদ্ধি ও মননের ঝলকানিই যেন আজ শেষ কথা, যেখানে শোষণ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজে কতটা অসহায়ত্ব বেঁচে থাকে একদল প্রান্তিক এবং ক্ষমতাহীন মানুষ, তার চমৎকার শিল্পিত বয়ান আমরা দেখি মাহবুব আলীর উল্লেখিত গল্পসমূহে। এখানেই মাহবুব আলীর গল্পের মূল শক্তি বলে মনে করা হয়।
আমরা দেখি আধুনিক জীবন যন্ত্রণা, আশা-নৈরাশ্যের ঘেরাটোপে দলিত, সংগ্রামী জীবনাদর্শে অনুপ্রাণিত। আজ সাহিত্যও যেন কঠিন জীবন বাস্তবতার মুখোমুখি, যদিও অন্তচ্ছন্দ ব্যক্ততা লেখকের স্বকীয় পথ চলায় প্রধান বাঁধা বলে মনে করা হয়। আর সে বাধায় যেনো গল্পকার মাহবুব আলী আটকা পড়ে অনেকটা সনাতনী ভঙ্গিতে বুনছেন তাঁর গল্প বলে পাঠককূলের সাথে কথা বলে মনে হয়। কারন এখানে এ কথা মনে রাখতে হয় যে, সাহিত্য নিছক নীতিশিক্ষার মাধ্যম নয় বরং এটি জীবনকে উপলব্ধির বিশাল আধার, যেখানে শিল্প এবং নন্দন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমনটা আমরা বাংলা ক্ল্যাসিক গল্পে দেখতে পাই। এটা তো সর্বজনস্বীকৃত যে নীতিশিক্ষার জন্য আছে ধর্মীয় গ্রন্থ, যদিও অনেক লেখক জগতকে জাগতিক নীতিশিক্ষা দিতে চান তাঁর গল্পের মাধ্যমে। তবে একদল পাঠকও আবার তা সাগ্রহে গ্রহণ করে নেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তীতে সেই সাহিত্য পদবাচ্য হয় না। অবশ্য একথা সাহিত্যের যেকোন বিভাগের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং প্রণিধানযোগ্য বলে বিজ্ঞমহল বলে থাকেন।
আমরা বিগত বিশ এবং একুশ শতকের সন্ধিক্ষণে এসে দেখতে পাই বিশ্বব্যাপী সাহিত্য-সংস্কৃতির সকল স্তরেই যুগ-পরিবর্তনের বেপরোয়া হাওয়া লেগেছে। সেই পরিবর্তনশীল অস্থির পরিবেশের ধারবাহিকতায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সাহিত্য বিশেষ করে ছোটগল্প হয়ে উঠেছে সৃজনচঞ্চল এবং নতুন রূপ সন্ধানে এ-পর্বের লেখকরা সক্রিয়। তাই এ সময়ের কারো কারো গল্পে বাংলাদেশের আধুনিক ভাবধারার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। বিশ শতকের শেষ ধাপে এসে দেখা গেল পৃথিবীতে নানামাত্রিক মারণাস্ত্রের সমারোহ, ঘাতক ব্যাধিসমূহের প্রকটতা, পরিবেশ বিপর্যয়, তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এবং বিশ্বব্যাপী জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক ধরনের স্থুল প্রতিযোগিতা। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আশির দশকে গড়ে ওঠা ছোটকাগজের প্রলম্বিত বলয়ের মধ্যে উত্থান ঘটলো নব্বইয়ের এক ঝাঁক তরুণ সম্ভাবনাময় লেখকের। বিশ্বব্যাপী বিকেন্দ্রীকতার রথে চড়ে এ-সময়ের লেখকরা তাদের শব্দভাষায় উপ-ভাষা, মান ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, প্রমিত ভাষা, দেশি-বিদেশী ভাষার ব্যবহারে গল্পের সামগ্রিক অর্থরূপ প্রকাশে ঘটালেন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ। যা থেকে পাঠকের নির্বাণ লাভ দুরূহ হয়ে উঠলো। এখানে আমরা দেখি গল্পকার মাহবুব আলী তাঁর গল্পে প্রচলিত চলিত ভাষায় বিশেষ করে দিনাজপুরের আঞ্চলিক ভাষায় সংলাপ নির্মাণের মাধ্যমে তাঁর গল্পের আখ্যান বুনে যেন লেখকের দায়কে মেটানোর চেষ্টা করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত সময়ের দ্রোহ, ক্ষত এবং মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র আকার চেষ্টা করেছেন আপ্রাণভাবে। হয়তো তাঁর গল্পের নান্দীপাঠ কোন একসময় নিশ্চয়ই করা হবে। তিনি নিশ্চয়ই মূল্যায়িত হবেন, এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
কোনো নীতিকে আশ্রয় করে বাঁধাধরা নিয়ম কানুনকে গ্রহণ করে শিল্প সৃষ্টি হলেও মহৎ শিল্প সৃষ্টি হয় না একথা আমরা সকলেই জানি। সুখ-দুঃখ, পাপ পুণ্য, সুনীতি, দুর্নীতি, কাম-ক্রোধ ইত্যাদির সম্মিলনেই মানুষের জীবন। ষোলআনা ভালো বা ষোলোআনা মন্দবলে কিছু হয় না জীবনে। জীবনে অপূর্ণতা আছে, ভাল মন্দ আছে, সুতরাং সাহিত্য যদি জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকে তাহলে এখানে মহামানবোচিত জীবনাঙ্কন কিংবা নীতিশিক্ষা কাম্য হতে পারে না। আবার হলেও খুব বেশি দোষের নয় বলে বিশেষজ্ঞমহল মত দিয়ে থাকেন। আমিও তেমনটাই মনে করি। তবে লেখক যদি অনুপম ভঙ্গিমায় নীতিকথাকেও গল্পের ছলে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করে এবং পাঠক যদি তা গ্রহন করে তাহলে সে চেষ্টায় দোষের কিছু আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য লেখকের পক্ষে সুনীতি সংঘের সভ্য হওয়া অপেক্ষা নন্দন কানন কোকিল হওয়া অধিক বাঞ্চনীয়, নচেত সে সাহিত্য টিকবে না বলে ধরে নয়ো যায়। সৌন্দর্য এবং কদর্য নিয়েই এই পৃথিবী। আজকে যা নীতি, কালকে তা দুর্নীতি। আজকে যা সংস্কার, কালকে তা কুসংস্কার। নীতিকেন্দ্রিক সাহিত্য কখনই চিরন্তন হতে পারে না। যেমনটা আমরা প্রাগৈতিহাসিক, লালসালু, আব্দুল্লাহ, হৈমন্তী কিংবা খোয়াবনামা, পদ্মা নদীর মাঝি সহ বিবিধ কালজয়ী গল্পে দেখতে পাই। বলা হয়ে থাকে, পরিবর্তন প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে প্রচলিত ভাবনার সাথে নতুন চিন্তার সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই দ্বন্দ্ব মূলত লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং সামষ্টিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে স্পষ্ট হতে আমরা দেখি, এক্ষেত্রে গল্পকার মাহবুব আলী পূনরাধুনিক এবং সহজিয়া বাংলা সাহিত্যের ঢঙ্গে রচিত অনন্য আখ্যান তার প্রথম বই ‘অস্তিত্বের পলায়ন যা প্রকাশিত হয় আগষ্ট ১৯৯২ সালে। এতে ১০টি ছোটগল্প সংগ্রথিত হয়। পরবর্তীতে বইটি রিভাইজড করে প্রকাশিত হয় ২০১৮-র আগস্ট মাসে। ওই বছর একইসঙ্গে আরও পাঁচটি গল্পবই প্রকাশিত হয়: ভয় (৮টি গল্প), পিঙ্গল বিকেলের আয়নায় (৮টি গল্প), অযোগ্যতার সংজ্ঞা (১০টি গল্প), রাত পাহারা চোখ (৯টি গল্প) এবং গোপনীয়তার অলিগলি (৪টি বড়গল্প) যা প্রসঙ্গক্রমে পূর্বেও বলা হয়েছে। তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতা বিষয়ক ‘ছোটগল্পের নির্মাণ শৈলী বইটি পাঠক মহলে সমাদৃত হয়।এটিও ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় প্রকাশিত হয়।
এখন পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গল্পের সংখ্যা প্রায় ষাটটি, প্রায়োপন্যাস বা উপন্যাস সংখ্যা চার, উপসম্পাদকীয় প্রায় দু-আড়াই ’শ এবং তিনি বেশকিছু কবিতাও লিখেছেন যা স্থানীয় দৈনিক-সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন পত্রিকা যেমন: সাপ্তাহিক ২০০০, মানবজমিন, শব্দঘর, লিখনী, অন্যদিগন্ত, ভোরের কাগজ, জনকণ্ঠ, সাম্প্রতিক দেশকাল, নন্দন, অনুরণন, জয়তী এবং অনলাইন ম্যাগাজিন রাইজিং বিডি, ইরাবতী, সাহিত্য ক্যাফে, বাংলা নিউজ ২৪, বিডি নিউজ ২৪, জলভূমি, জলফড়িং, ইত্যাদিতে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া তিনি কখনো কখনো অনলাইন ব্লগে লেখেন।
গল্পকার মাহবুব আলী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার-এর শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধীন সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগ-এর ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক লাইব্রেরির ‘অমর একুশে সাহিত্য প্রতিযোগিতায় ১৯৮৭ সালে কবিতায়; ১৯৮৯ সালে ছোটগল্প ও প্রবন্ধে জেলা পর্যায়ে তিনটি শীর্ষ পুরস্কার লাভ করেন। একইভাবে ১৯৯১ সালে প্রবন্ধ ও গল্পে আরও দুটি পুরস্কার। এবারের সাহিত্য সম্মেলনে বিভাগীয় লেখক পরিষদ রংপুর থেকে তিনি বিভাগীয় লেখক পরিষদ রংপুর সাহিত্য সম্মাননা-২০২১ এ ভূষিত হচ্ছেন জেনে তাঁকে জানাই হৃার্দিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। লেখকের উত্তরোত্তর সম্মৃদ্ধি কামনা করছি। তিনি দিনাজপুরের অন্যতম গল্পকার বলে পাঠক ও শিল্প সাহিত্য সমাজে বিদিত।
পেশাগত জীবনে তিনি উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক উত্তরা’-র সহকারী সম্পাদক হিসেবে ১৯৮৬-র মধ্যভাগ থেকে ১৯৯৩-এর প্রথমার্ধ পর্যন্ত কাজ করেন। এখানে তিনি মূলত সম্পাদকীয় ও সাহিত্যবিভাগ পরিচালনা ও দেখভাল করতেন। পূর্বেই বলেছি তিনি ছবি আঁকেন। তার অঙ্কিত বিভিন্ন স্কেচ এবং কার্টুন স্থানীয় ও ঢাকার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, গল্পকার মাহবুব আলীর প্রকাশিত সকল বইয়ের প্রচ্ছদ পরিকল্পনা তাঁর নিজের হাতে করা। লেখক পরবর্তীতে সংবাদপত্র থেকে বের হয়ে তিনি দিনাজপুরের প্রতিনিধিত্বশীল অন্যতম উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) সিডিএ, এসপিপি এবং সিটিএস-এ যথাক্রমে ডকুমেন্টেশন অ্যান্ড রিসার্চ, মাস-মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন, মনিটরিং অ্যান্ড ইম্পেক্ট স্টাডি, প্রজেক্ট প্রপোজাল ডেভেলপমেন্ট, রিপোর্টিং অ্যান্ড ডোনার লিংকেজ-এ ‘কী-পারসন হিসেবে কাজ করেছেন। পরিশেষে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাস্ট্রবিজ্ঞান প্রভাষক হিসেবে ষোলো বছর কাজ শেষে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর অন্যতম আরেকটি পরিচয় তিনি বিগত আগষ্ট ১৯৯৫-এ দিনাজপুরে সংঘঠিত পুলিশ কর্তৃক ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহিদ মেহরাব আলী সামু তারই কনিষ্ঠ সহোদর। ওইদিন তার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ঘরোয়া আয়েজনের জন্য কেনাকাটা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হয়। এবং সেই আন্দোলনে লেখক সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
গল্পকার মাহবুব আলী দিনাজপুরের কৃতি সন্তান। কবি উঠে এসেছেন দিনাজপুরের সোঁদা মাটির গন্ধমেখে, তাই তো তাঁর গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এ সোঁদা মাটির গন্ধ আমরা দেখতে পাই। দিনাজপুরের আলো, বাতাস, মাটি, পরিবেশ, জীবন-যাপন, মুখের ভাষা এবং ধানকেন্দ্রিক ভেতো কৃষ্টি প্রভৃতিই হলো তাঁর সৃষ্টিশীল দুনিয়ার অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয়। তাঁর হাত ধরেই দিনাজপুরের গল্পকারের শূন্যস্থান যেমন পূরণ হয়েছে, তেমনি তাঁর হাতেই আমাদের বাংলা সাহিত্যের গল্পের দুনিয়া শক্তিশালী হোক এবং তিনি বাংলা গল্পসাহিত্যে পাকাপোক্ত স্থান করে নিন এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি। আহমেদ তানভীর এর ‘মাহবুব আলীর গল্প : জীবনদর্শনের নান্দনিক শব্দছবি প্রবন্ধের সুরে বলা যেতে পারে তাঁর অধিকাংশ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম ‘শিহাব। কিন্তু শেষাবধি ‘শিহাব নামটি কোনো ‘আইকনিক চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি, যদিও লেখক শিহাবের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তার গল্প বলে গেছেন সাফল্যের সঙ্গে। আবার একই গল্পের ‘রিপিটেশন হয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থে। এসব ব্যাপারে আরো সতর্ক হতে হবে। বইয়ের অধিকাংশ প্রচ্ছদই লেখকের নিজস্ব কাজ অথবা আন্তর্জালিক ছবি থেকে প্রস্তুতকৃত কিংবা গল্পের অলংকরণের অংশবিশেষ ফলে পেশাদার কোনো শিল্পীর প্রচ্ছদে বইগুলোর প্রকাশ আরো সুন্দর ও নান্দনিক হতে পারতো একথা বলা যেতেই পারে।
আত্মপক্ষ সমর্থন করেই শেষ কথায় এ কথা বলতেই হয় কিংবা কৈফিয়তও বলা যেতে পারে, এখানে আমি গল্পকার মাহবুব আলীর সৃষ্ট গল্পসাহিত্যের সাহিত্যমান বিশ্লেষণ করছি না, গল্পসাহিত্য নিয়ে বিশ্লেষণ করার ধৃষ্টতা দেখানোর সাহসও আমার নেই, আমি শুধু গল্পকার মাহবুব আলীর গল্পসমূহ নিয়ে একান্ত আমার ভাবনার কিছু কথা বললাম মাত্র। কিংবা তাঁর গল্পের দুনিয়ার একটি সরলরৈখিক আলোচনার মাধ্যমে পাঠককে উষ্কে দেওয়ার চেষ্টা করলাম বলা যায়। গল্পকার হিসাবে তিনি একদিন পাঠকের মনে স্থায়ী আসন করে নিবেন এবং বাংলা গল্পসাহিত্যে তিনি দিনাজপুরের প্রতিনিধিত্ব করে গল্পকার হিসেবে তিনি তাঁর জায়গাকে সুদৃঢ় করবেন এ কথা বলা এখন শুধুই সময়ের দাবী।
পরিশেষে গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও কবি মাহবুব আলীর সুস্থতা ও সাফল্য কামনা করছি।
সহায়ক পাঠ :
- আহমেদ তানভীর; ‘মাহবুব আলীর গল্প : জীবনদর্শনের নান্দনিক শব্দছবি’- দৈনিক খোলাকাগজ, ০৭ মে ২০২১।
- প্রকাশিত ৮টি বই: অস্তিত্বের পলায়ন, অযোগ্যতার সংজ্ঞা, ভয়, পিঙ্গল বিকেলের আয়না, রাত পাহারা চোখ, গোপনীয়তার অলিগলি এবং ছোট গল্পের নির্মানশৈলী প্রভৃতি।
- গল্পকার মাহবুব আলীর সাক্ষাৎকার: লেখক
পড়ুন প্রবন্ধ: রুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি

