রবীন্দ্রনাথ ও গ্রামায়ণ: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ৬ আগষ্ট ২০২২ সালে দৈনিক উত্তরবাংলা ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধটি আবার পড়ার আমন্ত্রণ]
সম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের মহামারী সংক্রমণ আমাদেরকে আবারো নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষপটে একথা জোর দিয়েই বলা যায়, বাংলাদেশের দূর্যোগ মোকাবেলা এবং সামাজিক নিরাপত্তার যে দুর্দশাগ্রস্থ চিত্র, তার উন্নয়নে চাই গ্রামের মানবিক উন্নয়ন। চাই গ্রামায়ণ, চাই সত্যিকারের উন্নত গ্রাম বাংলাদেশ। একটি সু সমন্বিত গ্রামায়ণই পারে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে বিশ্বে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে। ফুলঝুরি উন্নয়ন স্রোতে গ্রামকে সেভাবে তৈরি করতে না পারায় আজ আমরা এর প্রভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এখনই গ্রামায়ণে মনোযোগি না হলে আমাদেরকে এর কুফল ভোগ করতে হবে দীর্ঘদিন। স্বাধীনতার ৫০ বছর হতে চললো অথচ যে মহান আদর্শ এবং লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে এ দেশকে স্বাধীন করতে যে ত্যাগ আর প্রাণের মূল্য দিতে হয়েছিল তার সিকি ভাগও আমরা অর্জন করতে পেরেছি বলে জোর দিয়ে বলা যায় না। সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো যথাযথ না থাকায় সরকারি ত্রাণসহ সকল সেবা নিয়ে চলছে হরিলুট। একটি আদর্শ গ্রাম কাঠামো থাকলে আজ এ কথা বলার অবকাশ হয়তো থাকতো না। স্বাধীনতার পরপরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান যে গ্রামায়ণের উন্নয়ন কাঠামো নির্মানে হাত দিয়েছিলেন তা আজও অধরাই থেকে গেছে। বঙ্গবন্ধু তার বিভিন্ন ভাষণে বরাবরই বাংলাদেশের উন্নয়নে গ্রাম উন্নয়ণ আগে এ কথা জোর দিয়েই বলেছিলেন। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাম উন্নয়ন কাঠামো ধরেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রামায়ণের সূচনা করেছিলেন।
এবার প্রসঙ্গ কথায় আসি, বাংলার উন্নয়ন কথা ভারতবর্ষের উন্নয়নে কবি গুরু যে কাঠামোর কথা বলেছেন তা আজও গ্রাম বাংলা তথা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য সমান প্রযোজ্য। তাঁর বাতলে দেওয়া পথেই বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব এবং বঙ্গবন্ধুও কবি গুরুর এ দর্শনকে গ্রহন করেছিলেন স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের উন্নয়নে। তাই এ প্রবন্ধে গ্রামায়নের স্বরুপ নিয়ে কিঞ্চিত আলোকপাতের চেষ্টা করা হবে।
আমরা জানি তৎকালীন ভারতবর্ষীয় সমাজ ছিল দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি ধনিক শ্রেণি, অপরটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী । রবীন্দ্রনাথ একটি অংশকে পেছনে ফেলে অপরাংশের উন্নয়নের বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মানবিক উন্নয়ন ধারণাটি ছিল মূলত গ্রামীণ উন্নয়ন কেন্দ্রিক। তাঁর গ্রামোন্নয়ন ভাবনাটি ছিল সামগ্রীক উন্নয়ন ভাবনার অংশ। তিনি মনে করতেন, কৃষি ভিত্তিক গ্রামের উন্নতি ব্যতিরেকে ভারতবর্ষীয় সমাজের সামগ্রীক উন্নয়ন সম্ভব নয়। যেহেতু আশি শতাংশ মানুষ ছিল কৃষিজীবি। একদিকে কৃষক সমাজের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে শহরের চাকচিক্যময় সমাজ, অপরদিকে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার নিন্মমান ও শিক্ষার আলোবঞ্চিত-চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত-কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও দারিদ্র্যের চাকায় আষ্টে পৃষ্টে নিষ্পেষিত অমানবিক জীবন যন্ত্রণা জমিদার কবিকে ভাবিয়ে তুলেছিল। এই ভাবনার পেছনে কাজ করেছে তাঁর মানবিক চেতনা। তিনি চির অধিকার বঞ্চিত এই মানুষগুলিকে আত্মশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার অনুকুলে সেচ্চার ছিলেন। স্বদেশী সমাজ গড়ে তোলা, গ্রাম-গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য তিনি স্কুল নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মান, সুপেয় জলের জন্য পুকুর খনন, স্যানিটারির সুব্যবস্থা, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। এসবই ছিল তাঁর সমাজনৈতিক ভাবনার অন্তর্গত মানবিক উন্নয়ন ভাবনা। এ প্রসঙ্গে বলা যায়-
“আজ চূড়ান্ত বিচারে মানব উন্নয়ন মানে মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। ‘মানুষের উন্নয়ন‘ বলতে বুঝায় মানব সম্পদ উন্নয়ন, মানব সক্ষমতার বৃদ্ধি ও প্রসার। উন্নয়নের সুফল প্রত্যেক মানুষের জীবনে পৌঁছে দেয়ার অন্য নাম মানুষের জন্য উন্নয়ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুফল সমাজের প্রতিটি মানুষ যেন ভোগ করতে পারে। মানুষের দ্বারা উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে বোঝায়। এ অংশগ্রহণ শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নয়,বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যে সব দিক মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, সে সব দিক নিয়ন্ত্রণ নয় বরং সে দিকগুলোকে প্রয়োজনবোধে প্রভাবিত করার সুযোগ প্রতিটি মানুষের থাকে। তাহলে সে মাত্রিকতাকেই মানুষের দ্বারা উন্নয়ন বলে অভিহিত করা হয়।” (বাদল কুমার ঘোষ (১৪০৬ বাংলা, বিকল্প উন্নয়ন দর্শন; রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তার আলোকে। বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা। ঢাকা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বার্ষিক সংখ্যা: পৃঃ ১৬৮)
রবীন্দ্রনাথ জোর দিয়ে বলেন, গ্রামীণ দারিদ্র্যের মূল কারণ হলো গ্রামের মানুষের আত্মবিশ্বাসের অভাব যা তাদের সর্বদাই সরকারে মুখাপেক্ষী করে তোলে। তাই ঐক্যের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের আত্মশক্তি জাগিয়ে তোলাকে তিনি প্রাথমিক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি কখনো বিশ্বাস করেননি শুধুমাত্র আয়ের অভাবেই দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়। তিনি মনে করতেন যে, দারিদ্র্যের ভয় ভূতের ভয়ের মতো। কোনো দেশ ধনী কি দরিদ্র্য তা নির্ভর করে সে দেশে গরিবের অর্থ উপার্জনের উপায় বা রাস্তা আছে কিনা তার ওপর।
এখানে একথা প্রণিধনযোগ্য যে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠির ঐক্যই হতে পারে গ্রামীণ জনগোষ্ঠির দারিদ্র্য থেকে মুক্তির অন্যতম পথ। এজন্য গ্রামকে উন্নয়নের প্রথম সোপান বা ইউনিট হিসেবে ধরেই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত। বর্তমান সরকার গ্রামকে শহর করার যে শ্লোগানে মুখরিত করছে সেটা নিছকই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলেই ধরে নেওয়া যায়। শহরায়ণের কুফল আমরা জানি, তাই গ্রামকে শহর না করে গ্রামে শহরের সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলেই গ্রামায়ণ সম্ভব। সম্ভব প্রকৃত উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন। ৬৮,০০০ গ্রামের উন্নয়ন হলেই বাংলাদেশ উন্নত হয়ে যাবে। এখানে গ্রামের উন্নয়ন বলতে গ্রামের মানবিক উন্নয়নকেই বোঝানো হয়েছে।
কবিগুরু নগরে জন্মেও গ্রামীণ জীবনের দুঃখ-কষ্টকে নিজের অন্তরে প্রতিস্থাপন করে তিনি সেই দুঃখ নিরসনের বাস্তব পথের সন্ধান করে গেছেন আমৃত্যু। রবীন্দ্রনাথ যতদিন গ্রামে ছিলেন ততদিন গ্রামকে, গ্রামের মানুষকে তন্ন তন্ন করে জানবার চেষ্টা করতেন। গ্রামবাসীর দিনকৃত্য, তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার ধরণ দেখে তাঁর প্রাণ ঔৎসুক্যে ভরে উঠত। আমরা দারিদ্য্রতা নিয়ে যেসব কথা এখন বলছি, রবীন্দ্রনাথ বহু আগে এর চেয়েও গভীর সে সব কথা বলে গেছেন। দারিদ্র্য যে শেষ পর্যন্ত মনের দৈন্য, সে কথাটি তাঁর মতো করে আর কেউ এমন স্পষ্ট করে বলতে পারেননি। সৃষ্টির আনন্দে তিনি চলতেন। তিনি নিজেই বলেছেন-
“আমার ইচ্ছা ছিল সৃষ্টির এই আনন্দপ্রবাহে পল্লীর শুষ্কচিত্ত ভূমিকে অভিষিক্ত করতে সাহায্য করা, তখন নানা দিকে তার (পল্লীর) আত্মপ্রকাশের নানা পথ খুলে যাবে। এইরূপ সৃষ্টি কেবল ধন লাভ করবার অভিপ্রায়ে নয়, আত্মলাভ করবার উদ্দেশ্যে।” (অভিভাষণ,রর, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৩৭৫)।
তিনি গভীরভাবে গ্রামকে অধ্যয়ন করেন এবং করেই এর নিরাময়ের উপায় বাতলান। অথচ আজ গ্রামের উন্নয়নে গ্রামের মানুষকে না জানিয়েই তাদের উপর তুঘলুকি উন্নয়ন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আখেরে এর সুফল গ্রাম পাবে কিনা, তা না ভেবেই রাজনৈতিক প্রোগ্রাম হিসেবে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় কিংবা কখনো কখনো নষ্ট করা হচ্ছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আজ অবদি গ্রাম উন্নয়নের নামে লক্ষ লক্ষ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে অথচ গ্রামায়ণ আর হয়নি। যে কথা কবি গুরু বলে গেছেন তার ধারে কাছেও আমরা হাটিনি।
আবার আসি রবীন্দ্র মহলে- মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রত্যক্ষভাবে জমিদারি দেখাশোনা ছেড়ে দিলে তাঁর প্রতিভূ নিযুক্ত হন জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ। মহালে গিয়ে তিনি গ্রামের দূরবস্থা দেখেই পিতাকে পত্র মারফর বলেন-সেন্ড মি ফিফটি থাউজেন্ড এবং এর উত্তর পান, কাম ব্যাক। অতঃপর তাঁর বড় ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথ প্রমুখের ব্যর্থতার পরে ১৮৯০ সালে জমিদারীর ব্যবস্থাপক নিযুক্ত হন রবীন্দ্রনাথ। তিনি অবশ্য গোড়ায় পান কেবল জমিদারি পরিদর্শনের ভার, বলা যায় শিক্ষানবিশ। সফল শিক্ষানবিশের পরে রবীন্দ্রনাথ পাওয়ার অফ এটর্নির মাধ্যমে পিতার কাছ থেকে সমগ্র স¤পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের সর্বময় কর্তৃত্ব পান ১৮৯৬ সালের ৮ আগস্ট। লক্ষণীয় ব্যাপারটি হল, জমিদারির ম্যানেজারিতেও কবিগুরু পূর্বসূরিদের হাঁটা-রাস্তা ছেড়ে এগোলেন প্রথা ভাঙার কঠিন রাস্তায়, সোজা কথায় গ্রাম সংগঠনের মাধ্যমে পল্লীমঙ্গল সাধনের মানসে তিনি বেঁছে নিলেন আবশ্যকীয় কাজের পাশাপাশি ভিন্নতর সমাজ উন্নয়নের পথ। বলা যায়, ফিরে চল মাটির টানে-কথাটা শুধু গান ছিল না, ছিল রবীন্দ্রনাথের অন্তরের কথা। তিনি জানতেন বিদেশী রাজা চলিয়া গেলেই দেশ যে আমার স্বদেশ হইয়া উঠিবে,তাহা নহে। তিনি বুঝেছিলেন, গ্রামই ভারত বর্ষের প্রাণ; গ্রামের উন্নতি ছাড়া দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই নিজের জমিদারিতে পল্লী উন্নয়নের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আমি একলা সমস্ত ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না। আমি কেবল জয় করব একটি বা দুটি ছোট গ্রাম। এদের মনকে পেতে হবে, এদের সঙ্গে একত্র কাজ করবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সেটা সহজ নয়, খুব কঠিন কৃচ্ছ্র সাধন। আমি যদি কেবল দুটি তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরি হবে।
তিনি নিজে ধনকামী জমিদার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও বলতে পেরেছিলেন: ধনের ধর্ম অসাম্য। ধনকামী নিজের গরজে দারিদ্র্য সৃষ্টি করিয়া থাকে। জমিদারি ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর যত বিতৃষ্ণাই থাকুক, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু দেশকে চিনেছিলেন এই জমিদারি পরিচালনা করতে এসেই। তাঁর জীবনে নতুন মোড় ফিরেছিল ১৮৯১ সালে। তখনই তাঁর মাটি সংলগ্ন জীবনটির গোড়াপত্তন। ১৯০৬ সালে কৃষিবিদ্যা ও গোষ্ঠবিদ্যা শেখাতে তিনি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে পাঠালেন আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯০৭ সালে কনিষ্ঠা কন্যা মীরার বিবাহের পর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীও বিদেশে প্রেরিত হন কৃষিবিদ্যা পড়ার জন্য। যে-যুগে সন্তানদের আই. সি. এস বা ব্যারিস্টার বানানো ধনী বাঙালি পরিবারের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, সে-সময় জনৈক ধনী জমিদারের পুত্র, জামাতা ও বন্ধুপুত্রকে চাষাবাদ শিখতে বিদেশ পাঠানোর মতো একটা বিপ্লবাত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন একমাত্র রবীন্দ্রনাথের মতো একজন দায়বদ্ধ স্বদেশ ভাবুকের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল।
মূলত তাঁর প্রজাদের সীমাহীন দুঃখ এবং তাদের গভীর অসচেতনতা তাঁকে খুবই পীড়া দিতো। তাই তাদের জন্যে কিছু একটা করার জন্যে তাঁর মন সব সময় ছটফট করতো। তাই তিনি লিখেছেন-
আমি নগরে পালিত, এসে পড়লুম পল্লীশ্রী’র কোলে-মনের আনন্দে কৌতূহল মিটিয়ে দেখতে লাগলুম। ক্রমে এই পল্লীর দুঃখ দৈন্য আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল, তার জন্যে কিছু করব এই আকাঙ্খায় আমার মন ছটফট করে উঠেছিল। (শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ও আদর্শ, রর, চতুর্দশ খন্ড, পৃ. ৩৭৮)।
স্থানীয় কৃষকরা তাঁরই কর্মচারীদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এ কথা জেনে তিনি অভিনব গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। গ্রামবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের পর তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অভিযুক্ত এমন কার্মচারীদের অনেকের চাকরিও চলে গিয়েছিল। কুষ্টিয়ায় প্রজাদের সুবিধার্থে তিনি দীর্ঘ রাস্তা করে দিয়েছিলেন। প্রজাদের কুয়োর পাড় বেঁধে দিয়েছিলেন। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তা কেনার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রজাদের ভেতর ভেদবুদ্ধির অবসানকল্পে কত উদ্যোগই না তিনি নিয়েছিলেন। সুযোগ পেলেই তিনি যে কোনো কর্মকে উৎসবের মেজাজ দেবার চেষ্টা করেছেন।
এখানেই রবীন্দ্র ভাবনার মৌলিকত্ব, তিনি যে বিচার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন যদি আজ আমাদের গ্রামের বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী হতো তবে ৯০ ভাগ মামলার নিষ্পত্তি গ্রামেই হয়ে যেতো, তাহলে হতো না মামলা কেন্দ্রিক রমরমা ব্যবসার প্রসার কিংবা মামলা জট। ফলে আজ আইনের শাসন যেন অধরাই থেকে গেছে। মামলা জটে বাংলাদেশ আজ ভারাক্রান্ত, সর্বত্র দূর্বৃত্তায়ণ। টাকা না হলে এখানে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। অথচ এর সঠিক সমাধান হতে পারে গ্রামায়ণ। যে পথ কবিগুরু অনেক আগেই বাঙ্গালী জাতিকে দিয়ে গেছেন। হায় বাঙ্গালি তুমি আজো বুঝলে না তোমার দাম, নিলে না, ভুল ভেবে ফেলে দিলে তার খাম।
তিনি যে গ্রাম সমিতি তৈরি করেন তার স্বরুপ ছিল এরুপ- প্রত্যেক গ্রামের লোকেরা তাঁদের ভিতর থেকে একজনকে প্রধান মনোনীত করতেন। ওই গ্রাম প্রধানরাই পরে আবার পরগণার সব প্রধানদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে মনোনীত করতেন। তাঁদের বলা হত পঞ্চপ্রধান। বিবাদ ও বিরোধ পঞ্চপ্রধানরাই মিটিয়ে দিতেন। শেষ আপীল রবীন্দ্রনাথের কাছে। এই বিচারে অসন্তুষ্ট হয়ে কোনো পক্ষ আদালতে নালিশ করলে গ্রামের লোকেরা তাঁকে সমাজচ্যুত করে দিতেন। রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত এই বিচার ব্যবস্থায় মামলার কোনো খরচ লাগত না, বিচারে বিলম্বও হত না। এই ব্যবস্থা কালীগ্রাম পরগণায় রবীন্দ্র প্রয়াণের পরেও দেশবিভাগ পর্যন্তই চালু ছিল।
তাহলে দেখা যায় যে গ্রামপঞ্চায়েত প্রথা প্রবর্তনেরও পূর্বসূরি সমাজতাত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিক ফজলুল হক ও জ্যোতি বসু প্রমুখ তাঁর দূরবর্তী ও সুদূরবর্তী উত্তরসূরিমাত্র।
আবার দেখা যায়, প্রজাদের কাছ থেকে সামান্য চাঁদা নিয়ে তার সঙ্গে জমিদারি তহবিল থেকে অর্থ যোগ করে তিনি তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধের ব্যবস্থা করেছিলেন। সে কারণেই যখন তিনি জমিদারি পরিচালনার কাজ শেষ করে স্ব-গৃহে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রজা তাঁকে সজলচোখে বিদায় জানিয়েছিলেন। তারা সেদিন তাঁকে দেব-রূপেই অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। পরজন্মে তাঁকে ফের জমিদার হিসেবেই পেতে তারা আগ্রহী ছিলেন।
এখানেও দেখা যায় কবি গুরুর অনন্য অর্থনৈতিক আবিস্কার। যে পাবলিক প্রাইভেট তথ্যে আমরা উন্নয়নের কথা বলি তাও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের দেখিয়েছেন এবং শিখিয়েছেন অনেক আগে। অথচ ইদানিং এ তথ্যে উন্নয়নের সংজ্ঞা আমরা নির্নয় করছি। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রায় ৯০ ভাগ কৃষকের এই উপমহাদেশের প্রয়োজন বিজ্ঞান ভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন। এজন্যে গ্রামীণ সমাজের উন্নয়নে তিনি নানামাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নিজের সন্তান ও জামাতাকে কৃষি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে এনেছিলেন গ্রামের দুঃখী মানুষগুলোর ভাগ্য বদলানোর জন্যে। আমেরিকা থেকে কৃষি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি শেষে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ পতিসরে আসেন। তিনি ক্ষেতে ট্রাক্টর চালান। সেই দৃশ্য দেখে স্থানীয় চাষিরা বিস্ময়ে হতবাক হন। তারা আধুনিক কৃষি খামার প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত হয়। কৃষকের প্রচলিত জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে কৃষি বিজ্ঞানীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার পক্ষে ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রায় ৯০ ভাগ কৃষকের এই উপমহাদেশের প্রয়োজন বিজ্ঞান ভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন। বিজ্ঞান ভিত্তিক কৃষি পদ্ধতি প্রবর্তনে কলের লাঙল ব্যবহারের কথা বলেছেন। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্যে পতিসরে ৭টি বিদেশি কলের লাঙল আনেন কলকাতা থেকে। সাথে আনেন একজন বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার।
তাই মূল ফসল ধানের পাশাপাশি ফল, সবজি চাষের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি হস্তশিল্পের ওপর খুব জোর দিয়েছেন। মৃৎশিল্প, ছাতা তৈরির কারখানা, ধান মাড়াইকল স্থাপনসহ নানা বিষয়ে তিনি তার পুত্র ও সহযোগীদের পরামর্শ দিয়েছেন। পতিসরে ১২৫টি গ্রামের ৬০-৭০ হাজার মানুষকে হিতৈষী সভায় যোগদানে উৎসাহিত করেছিলেন। এই সভা গ্রামের স্কুল, হাসপাতাল পরিচালনা করা ছাড়াও রাস্তাঘাট মেরামত, জঙ্গল পরিষ্কার ও ছোট খাটো বিচার আচারের দায়িত্ব নিয়েছিল। কৃষক নিজেই চাঁদা দিতো এবং জমিদার রবীন্দ্রনাথও রাজস্বের একটা অংশ এতে অনুদান দিতেন। মানবদরদি জমিদার রবীন্দ্রনাথ প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা বুঝতে পারতেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন একটি কৃষি ব্যাংক স্থাপনের। তাঁর নোবেল পুরস্কার থেকে লব্ধ টাকা কৃষি ব্যাংকের মূলধন হিসেবে প্রদান করেন। এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম কৃষি ব্যাংক। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে একাধিকবার ফসলহানির কারণে কৃষক এই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। অতঃপর ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যায়। নিজের চোখে দেখেছেন বলেই গ্রামের প্রতি যে অন্যায্য আচরণ করা হচ্ছিল, তাকে তিনি তাঁর লেখায় স্পষ্ট করে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। পল্লীর প্রতি এই অবহেলা শেষ পর্যন্ত আমাদের নগরকেও ভালোভাবে টিকতে দেবে না, সে কথা তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাঁর ভাষায় আজ পল্লী আমাদের আঁধমরা: যদি এমন কল্পনা করে আশ্বাস পাই যে, অন্তত আমরা আছি পুরো বেঁচে, তবে ভুল হবে, কেননা মুর্মূষদের সঙ্গে সজীবের সহযোগ মৃত্যুর দিকেই টানে। (উপেক্ষিত পল্লী, রর, চতুর্দশ খন্ড, পৃ. ৩৭২)
এখানেই রবীন্দ্র ভাবনায় গ্রামায়ণের যে চিত্র ফুটে ওঠে, আমরা যদি তাঁর এ মডেল ধরে বাংলাদেশের গ্রামায়ণের উন্নয়ন মডেল তৈরি করে সত্যিকারের গ্রামায়ণ শুরু করতে পারি, তবে তা বাংলাদেশকে পৃথিবীর অন্যতম মর্যাদাবান উন্নয়ন মডেলে পরিনত করবে এ কথা বলাই বাহুল্য। অথচ আমরা গ্রামকে শেষ করে শিল্পায়ণের নামে কৃষি ভূমির বারোটা বাজাচ্ছি। বুজরুকি উন্নয়ন তত্ত্বে গ্রামকে ধ্বংস করে গ্রামের সহজ সরল জীবনবোধকে শহরের নোংরা বস্তির অলিতে-গলিতে মিশিয়ে দিচ্ছি। গ্রামের মৌলিকত্ব আজ গার্মেন্টস নামের শিল্পের সুই ফোঁড়ে শেষ করছি। যে লোকটি গ্রামে মান সম্মান নিয়ে বাস করতো সে আজ শহরের বস্তিবাসী। হায় উন্নয়ন! হায় গ্রামীণ জীবন, এখনো কি আমাদের হুশ ফিরবে না। গ্রামকে যদি উন্নয়নের ইউনিট না করতে পারি কিংবা গ্রামায়ণ সফল ভাবে না করতে পারি তবে আমাদের আরো দূর্দিন অপেক্ষা করছে।
তিনি এও বলেছেন যে, গ্রামে অন্ন উৎপাদন করে বহু লোকে, শহরে অর্থ উৎপাদন ও ভোগ করে অল্পসংখ্যক মানুষ; অবস্থার এই কৃত্রিমতায় অন্ন এবং ধনের পথে মানুষের মধ্যে সবার চেয়ে প্রকান্ড বিচ্ছেদ ঘটেছে। ওই বিচ্ছেদের মধ্যে যে সভ্যতা বাসা বাঁধে তাঁর বাসা বেশি দিন টিকতেই পারে না। (ঐ, পৃ. ৩৭১)
গ্রামের মধ্যেই যেন আমাদের আসল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে সে কথা কবি গুরু নানাভাবে বলবার চেষ্টা করেছেন। মাতৃভূমির যথার্থ স্বরূপ গ্রামের মধ্যেই; এইখানেই প্রাণের নিকেতন; লক্ষ্মী এইখানেই তাহার আসন সন্ধান করেন। (ঐ, পৃ. ৩১১)
তিনি আরো বলেছেন, যতক্ষণ দেশকে না জানি, যতক্ষণ তাকে নিজের শক্তিতে জয় না করি, ততক্ষণ সে দেশ আপনার নয়। (দেশের কাজ, রর, চতুর্দশ খন্ড পৃ. ৩৬৮)
পতিসরে কবি একটি ধর্মগোলাও বসান, সেখানে এবং শিলাইদহে স্থাপন করেন আদর্শ কৃষিক্ষেত্র, যেখানে সুদূর অতীতের সেই ১৯১০ সালেই ব্যবহৃত হয় ট্রাক্টর, পাম্প সেট আর জৈব সার এবং চাষ হয় তখনকার উচ্চফলনশীল ফসল। নৌকো বোঝাই নষ্ট ইলিশ সস্তায় কিনে তাতে চূন দিয়ে মাটিতে পুঁতে তৈরি হয় এই জৈবসার। অধিক ফলনের জন্যে প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষি ল্যাবরেটরি। কালীগ্রামে চাষ সম্পর্কে এক চিঠিতে কবিগুরু তাঁর জনৈক কর্মীকে লিখছেন :
প্রজাদের বাস্তুবাড়ি, ক্ষেতের আইল প্রভৃতি স্থানে আনারস কলা খেজুর প্রভৃতি ফলের গাছ লাগাইবার জন্য তাহাদের উৎসাহিত করিও। আনারসের পাতা হইতে খুব মজবুত সুতা বাহির হয়। ফলও বিক্রয়যোগ্য। শিমুল, অক্সগুর গাছ বেড়া প্রভৃতির কাজে লাগাইয়া তার মূল হইতে কি রূপে খাদ্য বাহির করা যাইতে পারে তাহাও প্রজাদিগকে শিখানো আবশ্যক। আলুর চাষ প্রচলিত করিতে পারিলে বিশেষ লাভের হইবে।
শতবর্ষ আগেই তিনি আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির মূল সংকটের স্বরূপ চিহ্নিত করেছেন। গ্রাম ও শহরের বিভেদ নীতি যে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে একদিন প্রশ্নবিদ্ধ করবে সে আশঙ্কা তাঁর মনে ছিল। আমরা আজ বিদেশিদের দেয়া উন্নয়ন কৌশল নিয়ে কত কসরতই না করছি। অথচ আমাদের পূর্ব-পুরুষ রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি কতই না সমৃদ্ধ। তাঁর গ্রামীণ ভাবনায় যে সাম্য ও মানবিকতার সন্ধান পাই তা সত্যি বিরল।
তিনি মানবিক উন্নয়নকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, প্রথমে প্রয়োজন মনুষ্যত্বের উন্নয়ন আর মনুষ্যত্বের উন্নয়নের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো সামাজিক, মানবিক ও সামগ্রিক উন্নয়ন।
তাঁর উন্নয়ন ভাবনাগুলো ছিল মানবিক মূল্যবোধ ভিত্তিক। তিনি মনে করতেন আত্মিক উন্নয়নেরনের মধ্য দিয়ে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। কেবলমাত্র বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়নই উন্নয়ন নয়, একটি সমাজের সকল মানুষ যখন তাঁর মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারবে তখনই সে সমাজ উন্নত বলে ধরে নেয়া যাবে। এবং কোনো বিশেষ শ্রেণি নয় উন্নয়নের সুফল প্রতিটি মানুষের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যাওয়াকে তিনি সামগ্রিক উন্নয়নের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্র গবেষক অহমদ রফিক বলেন-
“মূলত মানবিক বোধে জারিত হওয়ার কারণে রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে এমন কথা ভাবতে ও বলতে পেরেছিলেন যে ‘শ্রেষ্ঠত্বের উৎকর্ষে সকল মানুষের সমান অধিকার। গ্রামে গ্রামে আজ মানুষকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে’। বহুকাল পূর্বে মানবাধিকার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এ উচ্চারণ আজকের মানবাধিকার কর্মীর কথা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় যে আজ কালকার মানবাধিকার আন্দোলন প্রধানত নগরকেন্দ্রিক, শিক্ষিত শ্রেণীভিত্তিক, সামান্যই গ্রামভিত্তিক। রবীন্দ্রচেতনা মানবিকতার গুণে ঋদ্ধ ছিল বলেই রবীন্দ্রনাথ স্বশ্রেণী থেকে বিত্তবান বা মধ্যশ্রেণীর চরিত্র উন্মোচন করতে দ্বিধা করেননি, বিশেষ করে অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে। শ্রমজীবী মানুষজন থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর শোষণ তার কাছে অমানবিক বলে মনে হয়েছে। গ্রামীণ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শুধু কৃষকের অর্থনৈতিক সমস্যাই অনুধাবন করেননি, লক্ষ করেছেন গ্রামে গ্রামে জমিদার-মহাজন শ্রেণীর বাইরেও মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্তিত্ব।” (আহমদ রফিক (১৯৯৮)। রবীন্দ্রভূবনে পতিসর, ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ। পৃঃ ১৮৫-৬)
তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনাকে কেন আমরা সমকালীন উন্নয়ন ভাবনার মূলে আনতে পারছি না? এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের একদিন না একদিন হতেই হবে। বিদেশিদের ভাবনার আলোকে আমাদের অর্থনীতিকে সাজাতে গিয়ে আমরা কতো ধরনের বৈষম্য তৈরি করে চলেছি। গ্রামে-শহরে বৈষম্য, অঞ্চলে-অঞ্চলে বৈষম্য, নারী-পুরুষে বৈষম্য আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সীমিত সাফল্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সার্বিক কল্যাণধর্মী উন্নয়নই যদি হয় আমাদের মূল লক্ষ্য, তাহলে রবীন্দ্রনাথের সাম্য ও সুন্দরের আকাঙ্খাকে আমাদের নীতি ভাবনার মূলে প্রতিস্থাপন করতেই হবে। রবীন্দ্র ভাবনার আলোকে আমাদের উন্নয়ন ভাবনাকে সাজাতে পারলে নিশ্চিতভাবেই বাঙালির স্ব-উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হবে। আর তখনই সম্ভব মানবিক উন্নয়ন।
শহর ও গ্রামকেন্দ্রিক দারিদ্র্য বৈষম্য অতীতে যেমন ছিল বর্তমানের চিত্র আরো ভয়াবহ যা থেকে আমাদের সমাজকাঠামোর মুক্তি ঘটেনি আজো অবধি। কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এলিট শ্রেণি কর্তৃক কৃষক সমাজকে স্বল্প মজুরির দ্বারা শ্রম শোষণ। বর্তমান আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যাংকগুলোর উদ্দেশ্য ক্ষুদ্রঋণদানের মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষকদের দারিদ্র্য দূরীকরণে সহযোগিতা করা। আহমদ রফিকের ভাষায়-
“বাংলাদেশের মোটামুটি হিসাবে প্রায় ১৩,০০০ বেসরকারি সংস্থা তথা এনজিও গ্রামাঞ্চলে রয়েছে।…সন্দেহ নেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয়ের ব্যবস্থা করতে, উপার্জন ক্ষমতা বাড়াতে দুঃস্থদের জন্য এ ধরণের প্রকল্পের গুরুত্ব যথেষ্ট-বিশেষ করে ভূমিহীন শ্রমজীবী মানুষ,সহায়হীন বিধবা গ্রামীণ মহিলা এবং অনুরূপ ক্ষেত্রের দুঃস্থ মানুষের জন্য।…কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার অর্থনৈতিক সফলতা নিশ্চিত করতে হলে একাধিক শর্তের বাস্তবায়ন অপরিহার্য। যেমন নিয়মিত ঋণদান পদ্ধতি, ঋণের প্রয়োজন-নির্ভর পরিমাণ, সময় মতো ঋণদান এবং ঋণ পরিশোধের সহায়ক শর্তাবলী ও সুদের পরিশোধ যোগ্য হার। তা না হলে ঋণদান অর্থহীন হয়ে ওঠে এই অর্থে যে এতে ঋণ গ্রহীতার আর্থিক উন্নতি সম্ভব হয় না। ফলে এর প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে বিপরীত। এমন কি ঋণ বিনিয়োগের পরিবর্তে জীবন যাত্রার প্রাত্যহিক খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয়ে যায়। তখন ঋণ অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের বদলে গ্রহীতার জন্য গলার ফাঁস হয়ে ওঠে। ক্ষেত্র বিশেষে এর পরিণাম হতে পারে মর্মান্তিক।” (আহমদ রফিক (২০১১)। নানা আলোয় রবীন্দ্রনাথ। ঢাকা: অনিন্দ্য প্রকাশ। ১ম খন্ড: পৃঃ ২০৩)
বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকের দারিদ্র্য বিমোচনে যে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে তা এত বেশি কঠিন শর্ত যুক্ত থাকে যে, তাতে কৃষকের কল্যাণ বেশি নাকি ব্যাংকের কল্যাণ বেশি হয় তা ভেবে দেখার বিষয়, যেমনটা আহমদ রফিকের জবানিতে ফুটে ওঠেছে।
সময়ের দাবির সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, একই সঙ্গে দারিদ্র্যের হারও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এবং বাড়ছে শ্রেণিবৈষম্য। ধনীরা ক্রমশ ধনী হচ্ছে আর দরিদ্ররা হচ্ছে দরিদ্রতর । পল্লীর মানুষের জীবন যাত্রা খুব নিকট থেকে দেখার কারণে তাঁর চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল শ্রেনি বৈষম্যের প্রকৃত চিত্রটি । ধন-সম্পদ যখন একটি শ্রেণির হাতে পুঞ্জিভুত হতে শুরু করে তখন তাদের মাঝে এক ধরনের লিপ্সা তৈরি হয়। তিনি ধনীর সম্পদ কেড়ে দরিদ্রদের মাঝে বন্টনের যে সাম্যবাদ, তার বিপক্ষে ছিলেন। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন ও সুবিধা সকলে যেন ভোগ করতে পারে অর্থাৎ ভাগা ভাগির আর্থ-সমাজ ব্যবস্থা। তিনি স্বার্থপরের মতো কোনো কিছু একা ভোগের বিপক্ষে ছিলেন। সামন্তবাদী এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর ভেতরে বাস করত এক মূর্তমান মানবিক মানুষ, যা তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছিল, শ্রেণিবৈষম্য একটি সমাজ কাঠামোতে অসন্তোষের আগুনের উৎপত্তি ঘটায়। তিনি সুখÑদুঃখের ভাগাভাগির অর্থনীতিতে বিশ্বাস করতেন, অন্যকে পেছনে ফেলে একা ভোগ করার বিরোধী ছিলেন। যেমনটা আজ আমরা জাতিসংঘের এসডিজি বা উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় দেখতে পাই। এ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য-
‘আমাদের দেশে কলার পাতায় খাওয়া তো কোনো দিন লজ্জাকর ছিল না, একলা খাওয়াই লজ্জাকর; সেই লজ্জা কি আমরা ফিরিয়া পাইব না? আমরা কি আজ সমস্ত দেশকে পরিবেশন করিতে প্রস্তুত হইবার জন্য নিজের কোনো আরাম কোনো আড়ম্বর পরিত্যাগ করিতে পারিব না? একদিন যাহা আমাদের পক্ষে নিতান্তই সহজ ছিল তাহা কি আমাদের পক্ষে আজ একেবারেই অসাধ্য হইয়া উঠিয়াছে?’ (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (১৩৯৩ বাং)। রবীন্দ্র রচনাবলী। কলকাতা: বিশ্বভারতী। ২য় খ-: পৃঃ ৬২৪)
তাঁর গ্রামোন্নয়ন ভাবনা ছিল একটি সাম্যবাদী অর্থনৈতিক মডেল। জনদরদী এই কবি অপরিসীম মমতা দিয়ে তিনি পল্লীর মানুষের দুঃখÑকষ্টের চাকায় নিস্পেষিত জীবন অবলোকন করে তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়াস নিয়েছিলেন।
দারিদ্র্য মানুষের জীবনে বহুমূখী সমস্যার সৃস্টি করে এবং সহজ-সরল-স্বভাবিক জীবনের পথ রুদ্ধ করে দেয়। নিশ্চল করে তোলে উন্নয়নের স্বভাবিক গতিকে। দারিদ্র্য, হতাশা, অশিক্ষা, কুসংস্কার পরস্পর সমান্তরালে গতিময় হয়ে ওঠে। সুতরাং দারিদ্র্য পরিবেষ্টিত সংস্কৃতিবিহীন এরূপ সমাজ কাঠমোর উন্নয়ন আশাতীত। তিনি মনে করতেন, মানুষের জন্য মানুষ এই কথাটি যতদিন মানুষ উপলব্ধি করতে না পারবে, ততদিন সমাজের উন্নয়ন সুদূর পরাহত। দুর্নীতি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব একটি সমাজ কাঠামোকে বিকল সমাজে রূপান্তরিত করে এবং সেখানে দারিদ্র্য চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে। এ প্রসঙ্গে আতিউর রহমান বলেন-
“দারিদ্র্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি মানুষের মনের দৈন্যকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে অন্যায় ও পার্থিব দারিদ্র্যের চেয়েও বহুগুণ নিকৃষ্ট হল জনগণের ভেতরের নিরাশা। আর সেকারণেই যথোচিত মানসিক প্রবণতা তৈরির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাই অনুভব করেছেন যে গরিবদের সমবেত হতে হবে, জোট বাঁধতে হবে। একা একা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে জেতা যাবে না। বাইরে থেকে এসেও কেউ গরিবের দুঃখ বঞ্চনা দূর করতে পারবে না। ভেতর থেকেই তা দূর করতে হবে।” (আতিউর রহমান (২০০৪)। রবীন্দ্র চিন্তায় দারিদ্র্য ও প্রগতি। ঢাকা: উৎস প্রকাশন। পৃঃ ৬৯)
দারিদ্র্য আমাদের জীবনের এক দুষ্ট ক্ষত। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন ভাবনা ভেবেছেন। শুধু ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি, বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন বাস্তবায়ণ করেছেন। দারিদ্র্য দুরীকরণে রবীন্দ্রনাথের এসব ভাবনা কালোত্তীর্ণ যার গ্রহনযোগ্যতা আজো আমাদের সমাজে স্বীকৃত এবং অনুকরণীয়। দারিদ্র্য দূরীকরণে তিনি সমবায়নীতির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ত্ব আরোপ করেছিলেন। একমাত্র দৃঢ়চেতা, সৎ, মানুষই পারে মানুষের ভেতরের আত্মবিশ্বাসী মানুষকে জাগিয়ে তুলতে, যিনি হবেন সমাজ প্রবর্তক ও পরিবর্তক এবং তাঁর দ্বারাই সমাজ ও রাষ্ট্র হবে চির দারিদ্র্য মুক্ত। যুগে যুগে সমাজে এমন প্রতিনিধি তৈরি করা ছিল তাঁর প্রত্যাশা।
তাই বলা যায়, আজ এই রবীন্দ্র জয়ন্তিতে আমাদের একমাত্র চাওয়া হোক রবীন্দ্র ভাবনার বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন অগ্রজ আমাদের বীর সন্তানরা, যে বাংলাদেশের জন্য ত্রিশ লক্ষ্য প্রাণ উৎসর্গীত হয়েছিল। যে সাম্য, ন্যায় ও মানবিক বাংলাদেশের জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল। সে বাংলাদেশ বিনির্মানে এখনই গ্রামায়ণ কর্মসূচি গ্রহন করা উচিত। গ্রামকে সকল উন্নয়নের ইউনিট ধরে যদি শহরের সকল সুবিধাদি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে গ্রামের মানবিক উন্নয়ন সম্ভব হলেই বাংলাদেশকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না। আজ করোনা ভাইরাস সংক্রমন আমাদেরকে আবারো আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো প্রথাগত উন্নয়ন, উন্নয়ন নয়। তাই প্রয়োজন মানবিক বাংলাদেশ, প্রয়োজন মানবিক গ্রামায়ণ, তবেই সকল অসাম্য ও অন্যায্যতা এবং অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ সম্ভব। এবং গড়ে তোলা সম্ভব সোনার বাংলাদেশ।
সহায়কপাঠ:
1.অভিভাষণ,রর, দ্বিতীয় খন্ড;
2.শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ও আদর্শ, রর,চতুর্দশ খন্ড;
3.রবীন্দ্র রচনা সমগ্র; পাঠক সমাবেশ সংগ্রহ;
4.মুখোপধ্যায়, প্রভাতকুমার (২০০৭)। রবি জীবনী। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স। ৫ম খ-;
5.মুখোপধ্যায়, শিশির (২০১০)। শ্রীনিকেতন: রবীন্দ্রনাথের পল্লিসংগঠন ও কৃষিচিন্তার জাতীয় গুরুত্বপূর্র্ণ প্রতিষ্ঠান। তপনকুমার সোম সম্পাঃ রবীন্দ্রনাথের শান্তিÍনিকেতন ও শ্রীনিকেতন। কলকাতা: দীপ প্রকাশন।
6.ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। সমবায়নীতি-১, রবীন্দ্র রচনাবলী।কলকাতা: বিশ্বভারতী। ১৪শ খন্ড;
7.ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্র রচনাবলী, কলকাতা: বিশ্বভারতী। ১০ম খন্ড;
8.বাদল কুমার ঘোষ (১৪০৬ বাং)। বিকল্প উন্নয়ন দর্র্শন; রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তার আলোকে। বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা। ঢাকা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বার্ষিক সংখ্যা;
9.আহমদ রফিক (১৯৯৮)। রবীন্দ্রভূবনে পতিসর, ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ।
10.আহমদ রফিক (২০১১)। নানা আলোয় রবীন্দ্রনাথ। ঢাকা: অনিন্দ্য প্রকাশ। ১ম খন্ড;
11.ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (১৩৯৩ বাং)। রবীন্দ্র রচনাবলী। কলকাতা: বিশ্বভারতী। ২য় খন্ড;
12.আতিউর রহমান (২০০৪)। রবীন্দ্র চিন্তÍায় দারিদ্র্য ও প্রগতি। ঢাকা: উৎস প্রকাশন।
13.ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। লক্ষ্য ও শিক্ষা; রবীন্দ্র রচনাবলী। কলকাতা: বিশ্ব¦ভারতী। ত্রয়োদশ খন্ড;
14.আতিউর রহমান (২০০৮)। রবীন্দ্রভাবনায় সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। ঢাকা: অ্যাডর্র্ন পাবলিকেশন।
চাষা হাবিব
কবি, গবেষক
পড়ুন প্রবন্ধ: রুচির দুর্ভিক্ষে হা’ভাতে সংস্কৃতি

