কবিতা নিয়ে আলোচনা, পড়ার আমন্ত্রণ…
নিঃশেষে বিভাজ্য: চাষা হাবিবের কবিতায় আত্মানুসন্ধান ও শূন্যতাবাদের মনস্তাত্ত্বিক পাঠ
সারসংক্ষেপ
চাষা হাবিবের কবিতা ‘নিঃশেষে বিভাজ্য’ এক গভীর আত্মসন্ধানী ভ্রমণের চিত্র তুলে ধরে যেখানে কবি নিজের অস্তিত্ব, জ্ঞানচর্চা, ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজের নানা বিভাজনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে আবার ফিরে আসেন এক শূন্যতাভরা অনুভবের কাছে। বারবার জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করেও তিনি ফিরে যান ‘ভাগশেষ’-এর দিকে— যা কোনো পূর্ণতা দেয় না, বরং এক ধরণের ক্লান্তি ও শূন্যতার জন্ম দেয়। কবিতায় ব্যবহৃত রেফারেন্স যেমন জীবনানন্দ, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন বা লালনের গান— সব কিছুই শেষ পর্যন্ত ‘ভাগফল’ নয়, ‘ভাগশেষ’ হয়ে উঠে। কবিতাটি প্রতীক, প্রতিধ্বনি ও ব্যঞ্জনায় ভরা, যেখানে একটি চক্রাকারে ঘুরতে থাকা আত্মার ক্লান্তি ও চেতনার বোধ ফুটে ওঠে। শেষ পঙক্তিতে কবি জানান, তিনি আবারও সেই শূন্য ভাগশেষের দিকেই চলেছেন, যেন মুক্তির চেয়ে বিভাজনই নিয়তি।
কীওয়ার্ড: নিঃশেষে বিভাজ্য, ভাগশেষ, ভাগফল, আত্মানুসন্ধান, শূন্যতাবাদ
পড়ুন : মাহবুব আলীকে নিয়ে বুক রিভিউ

ভূমিকা
আধুনিক বাংলা কবিতায় আত্মানুসন্ধান, অস্তিত্ববাদ এবং জ্ঞানচর্চার ক্লান্তি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে উঠে এসেছে। চাষা হাবিবের ‘নিঃশেষে বিভাজ্য’ কবিতাটি সেই ধারারই এক গভীর ও প্রতীকি প্রকাশ। কবিতাটিতে কবি আমাদের নিয়ে যান এক জ্ঞানচর্চা-ভিত্তিক মানসপটে, যেখানে তিনি সমস্ত গ্রন্থ, ধর্ম, কবি, সংখ্যা, গীত এবং দর্শনের মধ্য দিয়ে ঘুরে ফিরে খোঁজেন এক বোধ— কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা খুঁজে পান না। এই বোধহীনতাই যেন কবিতার কেন্দ্রে, যা ‘ভাগশেষ’ প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশিত।
চাষা হাবিবের কবিতা ‘নিঃশেষে বিভাজ্য’ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্লান্তি ও আত্মিক বিভ্রান্তির কবিতা, যেখানে কবি বারবার জ্ঞানার্জনের চেষ্টায় ডুবে গিয়ে উঠে দাঁড়ান— আবার পড়ে যান, কিন্তু কোথাও যেন কোনো পূর্ণতা পান না। কবিতাটি একটি চক্রের মত, যেখানে জ্ঞান, ধর্ম, ইতিহাস, দর্শন সব কিছুতেই কবি প্রবেশ করেন, কিন্তু সব শেষে তিনি ফিরে আসেন ‘ভাগশেষ’-এর কাছে— যা কোনো সমাপ্তি বা সিদ্ধান্ত নয়, বরং এক ধরনের অন্তহীন ক্লান্তি ও শূন্যতা।
কবিতার প্রথম অংশে কবি বলেন—
‘আমাকে নিঃশেষে বিভাজ্য করতে গিয়ে ভাগশেষ ফিরে গেছে বারবার’ —এই বাক্যেই কবিতার মূল বক্তব্য স্পষ্ট। জ্ঞান ও তথ্যের অসীমতার মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে কবি অনুভব করেন, এই জ্ঞান যেন কখনোই তাকে পূর্ণ করে না, বরং আরো বিভক্ত করে। তিনি রেফারেন্স দেন গ্রন্থ, গুরু, যৌবনরোধ, রোমানস, সংখ্যা, ধর্মীয় গীত— সব কিছু যেন তার মধ্যে একধরনের ‘মেমরি লোড’ তৈরি করে, যা তাকে বোঝায় না, বরং আরও ভারাক্রান্ত করে।
ভাগশেষ প্রতীকের তাৎপর্য
কবিতায় ‘ভাগশেষ’ শব্দটি প্রতীকী। এটি বোঝায় সেই অপূর্ণতা যা জ্ঞানচর্চার ফলাফল নয়, বরং তার বর্জ্যাংশ। কবি প্রশ্ন তোলেন— এই তথাকথিত ‘জ্ঞান’ আমাদের কোথায় নিয়ে যায়? রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল, মধুসূদন, লালন— সবাইকে স্মরণ করেও কবি যেন বলেন, এই সব মিলিয়েও তিনি পূর্ণতা খুঁজে পান না। ‘ভাগশেষ’ এখানে কেবল অঙ্কশাস্ত্রীয় নয়; এটি দার্শনিক, অস্তিত্ববাদী ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। কবির ভাষায়, যত জ্ঞানই অর্জন করা হোক না কেন, প্রতিবার শেষে যা বেঁচে থাকে তা এক ধরণের অকার্যকর ক্লান্তি— অর্থহীন বাকি অংশ। এই ‘বাকি’-তে কবি খুঁজে পান না কোনো মুক্তি, বরং স্থায়ী অস্থিরতা।
কবিতার ভাষা ও কাঠামো
গদ্যছন্দে রচিত এই কবিতাটি ধারাবাহিক মনস্তাত্ত্বিক প্রবাহের মত, যেখানে প্রতিটি পঙক্তি যেন একটি বোধের ভাঙা কণার মত ছড়িয়ে পড়ে। ‘গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়ি’ বা ‘জেগে উঠে আবার গুনতে থাকি’—এই লাইনগুলো ক্লান্তি ও বৃত্তের প্রতীক, যা কবিতাটির গূঢ় অভিপ্রায়কে ধারণ করে।
সাহিত্যিক ও দার্শনিক অন্তর্যাত্রা
কবিতায় রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল, মধুসূদন, ও লালন— এদের নাম এসেছে, কিন্তু কোনো আলোকবর্তিকা হিসেবে নয়। বরং এরা সবাই মিলেও কবির ‘ভাগফল’ তৈরি করতে পারেন না। এখানে জ্যঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শন (Sartre, 1956) ও আলবেয়ার কামুর ‘সিসিফাসের পৌরাণিক কাহিনি’ (Camus, 1942) -এর নিস্ফল পুনরাবৃত্তির চিত্র গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।
আত্মজিজ্ঞাসার সংকট ও পুনরাবৃত্তি
কবির একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে পুনরাবৃত্তি। প্রতিবার তিনি জানতে চান, জাগতে চান, ঘুমাতে চান, আবার শুরু করেন—কিন্তু ফলাফল একটাই:
‘অবশেষ আমি গুনেই চলি—
গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়ি— জেগে উঠে আবার গুনতে থাকি
অবশেষ ভাগশেষ।’
এই চক্রাকার পথচলা একটি অস্তিত্ববাদী প্যারাডক্স যেখানে চেতনার জন্মই হয় বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে। এই চক্রাকার যাত্রা— জ্ঞানার্জন, ঘুম, জাগরণ, পুনরায় চেষ্টা— এটাই কবিতার হৃদয়। এখানেই লুকিয়ে আছে আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব সংকট ও আত্মচেতনার গভীর আর্তি।
কবিতার কাঠামো ও ভাষা
কবিতাটি গদ্যছন্দে লেখা, কিন্তু ভাষার অন্তর্নিহিত ছন্দ, পুনরাবৃত্তি ও ধ্বনির ভিন্নমাত্রা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখে। ‘গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়ি— জেগে উঠে আবার গুনতে থাকি’ —এই পুনরাবৃত্তি নিজেই একটি ক্লান্তির ছন্দ তৈরি করে, যা কবিতার মূল বার্তার সঙ্গে একীভূত। কবিতার শুরুতেই বলা হয়েছে—
‘আমাকে নিঃশেষে বিভাজ্য করতে গিয়ে ভাগশেষ ফিরে গেছে বারবার’
এখানে ‘নিঃশেষে বিভাজ্য’ হওয়া মানে আত্মবিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত হবার প্রক্রিয়া। মানুষ নিজেকে জানার চেষ্টা করে, বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন অংশে—জ্ঞান, ধর্ম, যৌবন, ইতিহাস— সব কিছুতে ভাগ করে। কিন্তু সেই ভাগ করতেই গিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে, সেটাই ‘ভাগশেষ’ —যা আর কোনো কার্যকর ফল নয়, বরং শূন্যতা।
কবি ‘রেনুর মতো ভেজায় আমাদের ভাবনা’, ‘রোদের ডানায় জল মেখে’ বা ‘লালনের গান’ ইত্যাদি প্রতীকের মাধ্যমে দেখান, তিনি কেবল আত্মান্বেষণের পথে নন, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের এক উত্তরাধিকারী, যিনি এই ঐতিহ্যের মধ্যেও নিজের উত্তর খুঁজে পান না। এই নিঃশেষ চর্চা তাকে ঘুরিয়ে ফেরায় সেই ‘ভাগশেষ’-এ।
আধুনিকতাবাদ ও অস্তিত্ববাদ
এই কবিতায় জ্যঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করা যায়, যেখানে জীবন মানে একটি অর্থহীন পথ চলা, এবং মানুষ নিজেই তার অর্থ তৈরি করে। কিন্তু এখানে কবি সেই অর্থ তৈরির চেষ্টায় ক্লান্ত— তাকে ঘিরে রাখে ‘শূন্যতা’। টিএস এলিয়ট-এর The Hollow Men কবিতার মতোই এখানে মানুষের জ্ঞানচর্চা শেষ পর্যন্ত ক্লান্তি ও শূন্যতায় উপনীত হয়। কবি বলেন—
‘অবশেষ আমি গুনেই চলি—
গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়ি—
জেগে উঠে আবার গুনতে থাকি’
এটি যেন সেই চক্রাকার সময় ও বোধের প্রতীক, যেখানে মানুষ কখনোই সম্পূর্ণ হয় না— জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও জীবন সবই যেন ‘ভাগফল’ নয়, ‘ভাগশেষ’ হয়ে পড়ে।
উপসংহার
‘নিঃশেষে বিভাজ্য’ কেবল একটি কবিতা নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যাত্রাপথ, যেখানে আধুনিক মানুষের জ্ঞানচর্চা, আত্মপরিচয়ের খোঁজ, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং তার বিপরীতে তৈরি হওয়া শূন্যতার মুখোমুখি হবার গল্প। চাষা হাবিব এই কবিতার মাধ্যমে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন এমন এক দরজায়, যেখানে প্রবেশ করলে প্রশ্ন থাকে, উত্তর নয়। এবং সেই প্রশ্নই তার কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।
এই কবিতা শুধু ব্যক্তিগত বোধ নয়, এটি আমাদের সময়ের মানসিক ক্লান্তির প্রতিচ্ছবি। জ্ঞান, তথ্য, ইতিহাস— সব কিছু জানার পরেও আমাদের ভেতরটা কেন যেন শূন্যই থেকে যায়। ‘নিঃশেষে বিভাজ্য’ কবিতাটি সেই চিরকালীন প্রশ্ন তোলে— জানার শেষ কোথায়? পূর্ণতা কি আদৌ সম্ভব?
চাষা হাবিবের ‘নিঃশেষে বিভাজ্য’ একটি গভীরভাবে দার্শনিক কবিতা, যা আধুনিক মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, জ্ঞানচর্চা ও তার নিষ্ফলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি শুধুমাত্র আত্মসন্ধান নয়, বরং উত্তরাধিকার, শিখনপ্রক্রিয়া ও পরিচয়ের পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান।
তথ্যসূত্র:
Camus, A. (1942). The Myth of Sisyphus. Gallimard.
Eliot, T. S. (1925). The Hollow Men. Faber & Faber.
Habib, C. (n.d.). Nisheshe Bibhajya. [Unpublished Bengali Poem].
Lyotard, J. F. (1984). The Postmodern Condition: A Report on Knowledge. University of Minnesota Press.
Sartre, J. P. (1956). Being and Nothingness (H. E. Barnes, Trans.). Washington Square Press.
Tagore, R., Das, J., Islam, K. N., & Lalon, F. (Referenced poetically).
Sartre, Jean-Paul. Being and Nothingness.
T.S. Eliot. The Hollow Men.
জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – প্রাসঙ্গিক কবিতা।

