সম্বিত সাহা সেতু রচিত, নির্দেশিত ‘সাদা কাগজ’ নাটক নিয়ে কিছু কথা
‘সাদা কাগজ’ সমকালীন সমাজ-মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, এক আত্ম-উন্মোচনের কাব্যিক নাট্যভাষ্য। দিনাজপুর নাট্য সমিতির শতবর্ষীয় মঞ্চায়নে এ নাটক তার অভিনব শৈলী, প্রতীকী গভীরতা ও পরাবাস্তব উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শককে চমকিত করেছে। নাটকটি নিয়ে একজন দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গির কিঞ্চিত আলোকপাত মাত্র।

সাদা কাগজ: বিষয়বস্তু ও পরাবাস্তবতা
সম্বিত সাহা সেতু রচিত, নির্দেশিত এবং লেখক চরিত্রে অভিনিত ‘সাদা কাগজ’ নাটকটি সমকালীন বাংলা নাট্যচর্চায় এক অভিনব সংযোজন। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন লেখক, যিনি নিজের ভেতরের সত্য, অপরাধবোধ ও অক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ান। এ আত্ম-উন্মোচনের যন্ত্রণার ভেতর দিয়েই উন্মোচিত হয় সমাজ, সময় ও দেশজ বঞ্চনা, যা কেবল ব্যক্তির মানসিক টানাপোড়েন নয়, বরং সমকালীন সামাজিক ও দেশজ অভিঘাত-বঞ্চনার প্রতিফলন ঘটায়।
নাটকটি গড়ে উঠেছে পরাবাস্তব নাট্যভাষ্যে। এখানে যুক্তি অনুপস্থিত; বরং রয়েছে অবচেতন মনের গভীরতা, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং স্বপ্নময় পরিবেশ। সংলাপগুলো অনেক সময় ছন্দহীন, পুনরাবৃত্তিমূলক, কখনো বা অর্থহীন। কিন্তু সেই অর্থহীনতা দর্শককে টেনে নেয় ধ্বনি ও ছন্দের জাদুতে। মঞ্চে তখন বাস্তব আর অবাস্তব মিশে যায়, স্বপ্ন আর জাগরণে তৈরি হয় এক অদ্ভুত জগত। ‘সাদা কাগজ’ নাটকে তাই দেখা যায়। এখানে সংলাপগুলো অনেকসময় অর্থহীন, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং ছন্দহীন। কিন্তু সেই ছন্দহীনতাই দর্শককে টেনে নেয় ধ্বনির জাদুতে, শব্দের মন্ত্রমুগ্ধতায়।
নাটকের মূল প্রতীক সাদা কাগজ— যা সম্ভাবনার শূন্য ক্যানভাস হলেও শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় টাকার নোট, বিজ্ঞাপন বা রাজনৈতিক মেনিফেস্টোতে। ফলে নির্মল কাগজ ভরে ওঠে লোভ, ভোগ ও ক্ষমতার প্রতীকে। লেখক বুঝতে পারেন, নতুন প্রজন্মের চরিত্রগুলো শেকড়হীন, স্বপ্নহীন, দেশপ্রেমহীন; আর এর দায় তাঁরও। তাই আত্মবিচারে তিনি নিজের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন।
‘সাদা কাগজ’ মানে না লেখা কাগজ। কিন্তু নাট্যকার যখন গল্প খুঁজতে যান, তখন তিনি আবিষ্কার করেন— এই সময়ে তেমন কোনো চরিত্রই আর বেঁচে নেই। নেই বিপ্লবী, নেই সংস্কারক, নেই স্বপ্নদ্রষ্টা বা অভিযাত্রিক। বরং জন্ম নিচ্ছে ভাঙাচোরা, শেকড়হীন ও স্বপ্নহীন মানুষ। তাদের মস্তিষ্কে মাতৃভূমির কোনো মানচিত্র নেই; নেই দেশপ্রেমের বোধ। এই চরিত্ররা রূপ বদলায়, মুখোশ পরে; ক্ষমতা ও ভোগের নেশায় তারা পরিচিতি হারায়। লেখক বুঝতে পারেন, এই চরিত্রহীনতার দায় তাঁরও আছে। তাই আত্মবিচারের কঠোর মুহূর্তে তিনি নিজের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণাও করেন। আত্ম-উন্মোচনের নাট্য আয়নায় লেখক নিজেকে প্রশ্ন করেন, তিনি জন্ম দিতে পারেননি একজন দেশপ্রেমিক কিংবা একজন বিপ্লবীর। ফলে নাটকের শেষে তিনি নিজের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন— যা আদতে সৃষ্টিশীল মানুষের দায়বদ্ধতার নির্মম আত্মস্বীকৃতি। সৃষ্টিশীল মানুষেরা সামাজিক দায়মুক্তি এড়াতে পারেননা, লেখকও পারেননি। নিজের মৃত্যুদন্ড ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি চিনে নিতে পারেন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা অসম্পূর্ণ অসহায় চরিত্রদের। তিনি আবার তাদের জন্য, তাদের মুক্তির জন্য কলম ধরেন। লেখক বলেন-
ফুরালে কুড়াবি তুই
সোনার কড়ি রূপার মাকই
চোখের জলে ভাসাবি ভুঁই
এইতো যন্ত্রনা
আবার সোনার মানুষ ফেলে করিস সুরের বন্দনা
এইতো যন্ত্রনা।
নাটকটি নির্মিত হয়েছে পরাবাস্তব শৈলীতে। এখানে যুক্তির চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে অবচেতন মনের গভীরতা, মানসিক দ্বন্দ্ব ও স্বপ্নময় পরিবেশ। সংলাপগুলো অনেকসময় অর্থহীন বা পুনরাবৃত্তিমূলক হলেও, সেই ছন্দহীনতাই দর্শককে টেনে নেয় শব্দ ও ধ্বনির জাদুতে।
প্রতীকী ভাষ্য ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
নাটকের ভেতরে কাগজের প্রতীক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাদা কাগজ একদিকে সম্ভাবনার প্রতীক— যেখানে লেখা যেতে পারত নতুন বিপ্লব, নতুন স্বপ্ন, নতুন ইতিহাস। কিন্তু অন্যদিকে সেই সাদা কাগজই বদলে যায় টাকার নোটে, রাজনীতির মেনিফেস্টোতে বা বিজ্ঞাপনের স্লোগানে। ফলে কাগজ আর শূন্য থাকে না, বরং তা ভরে ওঠে ভোগবাদী সমাজের প্রতীকে। এই প্রতীকায়ন নাটকটিকে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। চরিত্রহীন, গল্পহীন মানুষ আসলে এক অবিরাম দৌড়ে শামিল— যেখানে বিজয় বা পরাজয় কোনো কিছুই নেই, আছে কেবল যান্ত্রিক গতি। এর ভেতর দিয়ে নাট্যকার প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন— জন্ম ও মৃত্যুর বাইরেও কি মানুষের নতুন কোনো গল্প তৈরি করা সম্ভব? ফলে কাগজ আর নির্মল থাকে না; তা হয়ে ওঠে ক্ষমতা, লোভ ও ভোগের প্রতীক। চরিত্ররা মুখোশ পরে বারবার ফিরে আসে, আর লেখক তাদের চেনেন না।
সাদা কাগজ নাটক নিয়ে আমার প্রোজ পোয়েট্রি ‘সাদা কাগজের প্রলাপ’ পাঠকের জন্যে এখানে সন্নিবেশিত করা হলো।
সাদা কাগজ।
খালি, অথচ ভেতরে অদৃশ্য কোলাহল।
কালি ছোঁয়নি, তবু লেখা আছে অগণিত নাম—
যাদের আর কোনো দেশ নেই, কোনো মুখ নেই।
গল্পরা পালিয়ে যায় রাতের ঘুমে।
আমি খুঁজতে যাই—
ফিরে পাই শুধু ভাঙা আয়না,
মুখোশে মোড়া মানুষ।
তাদের চোখে নদী নেই।
তাদের নিঃশ্বাসে বারুদ নেই।
তাদের স্বপ্ন—
একটা মানচিত্রহীন হোলোস্ক্রিন,
যেখানে ভেসে ওঠে টাকার নোটের ডিজাইন।
সাদা কাগজ বদলে যায়।
নোটে। বিজ্ঞাপনে।
রাজনীতির মেনিফেস্টোতে।
একটা ফিল্টার লেগে যায় মুখে—
প্রতিদিন নতুন রূপ, প্রতিদিন নতুন সফটওয়্যার।
আমি চিনি না তাদের।
তবু তারা আসে,
বারবার আসে,
অচেনা নাম নিয়ে,
অচেনা মুখ নিয়ে,
অচেনা অ্যালগরিদমে বাঁধা হাসি নিয়ে।
ফুরালে কুড়াবি তুই—
সোনার কড়ি, রূপার মাকই—
কবিতা নয়, লেনদেনের মন্ত্র।
চোখের জল ভেসে যায় ডিজিটাল ভল্টে।
এই তো যন্ত্রণা।
কোথাও একটা মরুভূমি আছে—
তৃষ্ণাহীন, আকাঙ্ক্ষাহীন।
ধূলি উড়ে।
দৌড়ায় মানুষ,
পরাজয় নেই, বিজয়ও না।
শুধু দৌড়।
শুধু দৌড়।
আমি ভাবি—
যদি সব চাওয়া মিটে যায়,
তাহলে কি নতুন ক্ষুধা জন্ম নেবে না?
হ্যাঁ, জন্ম নেবে।
নতুন ঘুম। নতুন স্বপ্ন।
নতুন দুঃস্বপ্ন।
কখনো মনে হয়—
আমাদের আঙুলের রেখা নদীর মত বহমান,
কিন্তু কাগজে আঁকা মানচিত্রে আটকে গেছে।
আমাদের জিহ্বা একসময় তরবারির মত ধারালো ছিল,
এখন তা বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল।
তবু—
আমি শুনি অদৃশ্য মাদল বাজে।
তবু—
আমি চাই সময়কে চেপে ধরতে,
ফাটিয়ে ফেলতে ঘড়ির কাঁচ,
রক্তে মিশিয়ে দিতে অসমাপ্ত শব্দ।
সাদা কাগজ দাঁড়িয়ে আছে সামনে—
শূন্য নয়,
বরং এক অদৃশ্য ভবিষ্যদ্বাণী।
শব্দেরা জোনাকির মতো জ্বলে,
নেভে, আবার জ্বলে।
আর আমি, লেখক,
নিজের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরও
কলমে লিখি—
নতুন রক্ত, নতুন মুখ, নতুন গল্প।
(সাদা কাগজের প্রলাপ/ চাষা হাবিব)
এই প্রলাপ নাটকের মূল দর্শনকেই প্রতিফলিত করে। —আমরা ক্রমে মুখোশে আচ্ছন্ন, মানচিত্রহীন মানুষে পরিণত হচ্ছি। তবু লেখক কলম ফেলে দেন না; তিনি আবারও নতুন রক্ত, নতুন মুখ, নতুন গল্প লেখার শপথ নেন।
সাদা কাগজের মঞ্চ সজ্জা, আলোকায়ন, শব্দ এবং প্রপসের ব্যবহার নিঃসন্দেহে অনন্য তবে শব্দ প্রক্ষেপন আরও ভাল হতে পারতো বলে মনে হয়েছে। দৃশ্যায়ণের দীর্ঘসূত্রতা অনেকসময় কিছুটা বিরক্তির সূচনা করেছে। সময় বিচারে ১ ঘন্টার নাটক হলেই ভালো হতো, তবে দীর্ঘ হলেও নাটকটি দর্শককে ধরে রেখেছে শেষ পর্যন্ত এটাই অন্যতম প্রাপ্তি।
‘সাদা কাগজ’ নাটকটি শুধু একটি মঞ্চনাটক নয়; এটি সমকালীন সমাজ-মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, এক আত্ম-উন্মোচনের কাব্যিক নাট্যভাষ্য। দিনাজপুর নাট্য সমিতির শতবর্ষীয় মঞ্চায়নে এ নাটক তার অভিনব শৈলী, প্রতীকী গভীরতা ও পরাবাস্তব উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শককে চমকিত করেছে। বলা যায়, ‘সাদা কাগজ’ সমকালীন নাট্যচর্চায় নতুন আলো জ্বালিয়েছে।
দিনাজপুর নাট্য সমিতির শতবর্ষীয় মঞ্চে নাটকটির সফল উপস্থাপনা প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের সমকালীন নাট্যচর্চায় এটি এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
জয় হোক নাটকের, জয় হোক ভাববুদ্ধ লেখকের।
চাষা হাবিব
কবি ও গবেষক

