চুল নিয়ে চাষা হাবিবের তিনটি কবিতা
চুলের গান ।। চাষা হাবিব
১.
তোমার ভেজা চুলে
কি যাদু বেদনার অশ্রু যেনো টলটলে
মিশে ফেলে বিদিশার অন্ধকার তেলে জলে;
ত্রস্ত হরিণেরা চোখে রাখে চোখ জলের গানে
তুলে দেয় তূর্ণা নিশীথা ভ্রমরী চম্পক তালে;
অথচ খসে ফেলে আমার চুল চুলকানি মলমে;
২.
এলোমেলো চুলে এঁকে দেয় মানচিত্র
স্বৈর চিরুনির দাঁতে নির্মম গণহত্যায়
চেপে দেয় মনোহর সুগন্ধ ব্রাশফায়ার;
তোমার দেহছুয়ে নেচে যায় কালোকেশ
বাদামি পিঁপড়ায় ধেয়েই নামে স্বপ্নলোক;
অথচ কুদরতি তেল গিলে ফেলে আমার চুল;
৩.
রাতের ভাঁজে গলে পড়ে
গন্ধরাজ তেল জ্যোৎস্নায় ডুবে যায়;
রাতের রাজা বুকে তোলে কালোকেশী
তুমিও নরম শিশির মুছে দাও গভীর খাদে
যেখানে শ্রাবস্তি উঠোন হয়ে ওঠে খোলাচুল ;
অথচ আমার চুলে সেঁটে দেয় মনোহরি কলপ;
৪.
যখন অন্ধকার মেলে দেয় ডানা
তখন আমিও তোমার চুলের ভাঁজে
সেঁটে দেই রকমারি কস্তুরিত লালফিতা;
আর নগ্ন আঁধারে মুড়ে দেই রঙচটা কীলক
সেখানে তোমার ভেজা চুলে জাগায় স্বদেশ;
অথচ একাদশী চোখে লুট হয় আমার চুল;
৫.
যে চুলে পুড়ে যায় লঙ্কা–ট্রয়
জ্বলে ধূপের পাহাড় গান্ধার কাহার;
ভেজা চুলে তুমিও বনলতা সেন তাহার;
অথচ আমি বুদ হয়ে ছিঁড়ে দেই সুস্মিত
স্যানালের বোতামে আহত চুলের বাহার;
এখন অবাঞ্ছিত চুল গজায় আমার টাক মাথায়;
সেপ্টেম্বর ৭, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, দিনাজপুর।
চুল ও চিরনি ।। চাষা হাবিব
এঁটো রাতের বাদামী দুপুরে
খুন হয় একজোড়া চিরনি— থুথু-ভেজা চুল
রূপোলী সেফটিপিন বারবার ক্ষত দেয়
ক্ষতস্থান ধুতে গিয়ে ধুয়ে দেয় ধোয়া হয়— অর্ন্তবাস;
অথচ রাত জুড়ে দখলে ভেঙ্গে যায়— ভাঙ্গা হয়
চিরনির দাঁত, তখনও রাষ্ট্র খুঁজতে খুঁজতে খুঁজে পায়
থুথু-ভেজা চুল
পৌর কমিটির তদন্ত দলে জমা হয়
দাঁত ভাঙ্গা চিরনি, জং ধরা সেপটিপিন;
আর কবেকার অন্ধকারে মিশে থাকা
এঁটো রাতের থুথু— ভেজা চুল।
চুলের শরীর জুড়ে লেগে থাকা বাসী থুথুতেই
নেমে পড়ে তদন্ত দল—
আমরা দল বেধে টাচস্ক্রিনে ট্রল করি
বনলতা সেনকে— রাতজুড়ে কবির প্রেমে
দারিুচিনি দ্বীপের ভিতর।
হায় চুল! হায় চিরনি!
তুমিও রাতভর কর— দাঁত চুরি চিরনির।
চুল ও চিরনি-২ ।। চাষা হাবিব
রাতের শরীরে দুপুরের ছায়া,
চুলগুলো তখন রাষ্ট্রের মানচিত্রে ঝুলে থাকে—
একেকটা চুল, একেকটা সীমানা
যেখানে থুথু জমে নদীর মতো
আর সেফটিপিনের ধাতব ক্ষত
ঝিকমিক করে যেন উল্কাপিণ্ডের দাঁত।
চিরনি কথা বলে— তার দাঁতের ফাঁকে
আটকে থাকা অতীত বলতে চায় ন্যায়ের সংবিধান।
রাষ্ট্র ঘুমায়; তদন্ত কমিটি
ঘুমন্ত চুলের গায়ে লেপে দেয় সমন।
ঘামের রিপোর্ট।
আমরা টাচস্ক্রিনে স্ক্রল করি ইতিহাসের চুল
লাইক দিই বনলতা সেনের মৃত্যুসনদে;
কমেন্ট করি— দারুচিনি দ্বীপে এখনো নেটওয়ার্ক আছে।
হঠাৎ এক চুল বেড়ে ওঠে আকাশ পর্যন্ত
তার ডগায় বসে একটি চিরনি
মেঘ আঁচড়ে দেয়;
মেঘের ভিতর থেকে ঝরে পড়ে থুথু
আর সেই থুথুতেই জন্ম নেয়
নতুন রাষ্ট্র, নতুন কবি, নতুন তদন্ত কমিটি।
তখন রূপোলি সেফটিপিন খুলে ফেলে তার ধাতব ত্বক
ভেতর থেকে বের হয় এক জং ধরা পাখি—
সে উড়ে গিয়ে বসে ভাঙা চিরনির দাঁতে,
আর বলে— হায় চুল! হায় চিরনি!
তোমরাই তো সভ্যতার প্রথম মেটাফর।
রাতের শেষ প্রান্তে যখন আলো আসে
সব চুল মিশে যায় নদীতে— সব চিরনি ফিরে যায় অন্ধকারে
শুধু স্ক্রিনে ভেসে থাকে একটি দাঁতহীন রাষ্ট্র;
যার ইতিহাসের ভাষা— থুথু; আর নাগরিকত্ব— চুল।
পড়ুন কবিতা: কিছু মানুষ ও ক’জন কবি

